ইউরোপজুড়ে আকাশপথে ভয়াবহ অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। একযোগে বহু দেশে ফ্লাইট বাতিল ও বিলম্বের ঘটনায় হাজার হাজার যাত্রী পড়েছেন চরম দুর্ভোগে। নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য (ইংল্যান্ড), জার্মানি, ডেনমার্ক, আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, স্পেন, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মোট ৮ হাজার ৪৮০টি ফ্লাইট বিলম্বিত এবং ৬৯১টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
এই বিপর্যয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইউরোপের বড় বড় বিমান সংস্থা বা এয়ারলাইন, বিশেষ করে ডাচ জাতীয় এয়ারলাইন-কেএলএম, স্বল্পমূল্যের এয়ারলাইন-ইজিজেট এবং জার্মানির জাতীয় এয়ারলাইন-লুফথানসা। আমস্টারডাম, প্যারিস, স্টকহোম, জুরিখ, লন্ডনসহ ইউরোপের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে যাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেকের ভ্রমণ পরিকল্পনা ভেঙে পড়েছে, বাতিল হয়েছে ব্যবসায়িক সফর ও ছুটি কাটানোর সূচি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনা মহামারির পর ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানো ইউরোপের পর্যটন ও বিমান চলাচল শিল্পের জন্য এই সংকট বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠছে।
ফ্লাইট বিপর্যয় কারণ
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপর্যয়ের পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বিমানবন্দর ও এয়ারলাইনে জনবলসংকট, শীতকালীন আবহাওয়া ও খারাপ আবহাওয়ার প্রভাব, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল বা আকাশপথ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় চাপ, ছুটির মৌসুমে যাত্রী চাপ হঠাৎ বেড়ে যাওয়া এবং এক বিমানবন্দরের সমস্যা থেকে অন্য দেশে ডমিনো ইফেক্ট। একটি বড় হাব বিমানবন্দর অচল হয়ে পড়লে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে গোটা ইউরোপজুড়ে।
বিমানবন্দর ভিত্তিক ফ্লাইট বাতিল ও বিলম্ব
আমস্টারডাম স্কিফোল বিমানবন্দর: বাতিল হয়েছে ৩৯৪টি এবং বিলম্ব হয়েছে ৬৪৬টি ফ্লাইট। ইউরোপের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর স্কিফোলে বিপুলসংখ্যক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় হাজার হাজার যাত্রীর ভ্রমণ পরিকল্পনা ভেঙে পড়েছে। এটি নেদারল্যান্ডসের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার।
প্যারিস শার্ল দ্য গল বিমানবন্দর: বাতিলহয়েছে ৩৭টি এবং বিলম্ব হযেছে ৬৭৬টি ফ্লাইট। ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় বিমানবন্দরটিতে পর্যটক ও ব্যবসায়ী যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে, বিশেষ করে ছুটির মৌসুমে।
স্টকহোম আরলান্ডা বিমানবন্দর: বাতিল হয়েছে ২৭টি এবং বিলম্ব হয়েছে ৪২৩টি ফ্লাইট। সুইডেনের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও দীর্ঘ বিলম্বে যাত্রীদের ক্ষোভ বাড়ছে।
জুরিখ বিমানবন্দর: বাতিলহ য়েছে ২৩টি এবং বিলম্ব হয়েছে ৩৪৪টি ফ্লাইট। সুইজারল্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ এই বিমান চলাচল কেন্দ্র থেকে ইউরোপের বহু দেশে সংযোগ ফ্লাইট ব্যাহত হয়েছে।
লন্ডন হিথ্রো বিমানবন্দর: বাতিল হয়েছে ১৭টি এবং বিলম্ব হয়েছে ৬২৭টি ফ্লাইট। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর হিথ্রোতে বিলম্বের কারণে আন্তর্জাতিক যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন।
ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানবন্দর: বাতিল হয়েছে ১৫টি এবং বিলম্ব হয়েছে ৬২৭টি ফ্লাইট। ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে পরিচিত এই বিমানবন্দরের সমস্যা গোটা এভিয়েশন খাতে প্রভাব ফেলছে।
বার্সেলোনা বিমানবন্দর: বাতিল হয়েছে ১২টি এবং বিলম্ব হয়েছে ৪৫৫টি ফ্লাইট। স্পেনের পর্যটন শিল্পের জন্য এটি বড় ধাক্কা।
মাদ্রিদ বারাহাস বিমানবন্দর: বাতিল হয়েছে ৫টি এবং বিলম্ব হয়েছে ৪১০টি ফ্লাইট। স্পেনজুড়ে পর্যটন প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ডাবলিন বিমানবন্দর: বাতিল হয়েছে ১২টি এবং বিলম্ব হয়েছে ৩১০টি ফ্লাইট। আয়ারল্যান্ডগামী যাত্রীদের ভোগান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
লিসবন বিমানবন্দর: বাতিল হয়েছে ৯টি এবং বিলম্ব হয়েছে ৩৮৯টি ফ্লাইট। পর্তুগালের পর্যটন খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
(এছাড়া মিউনিখ, হামবুর্গ, কোপেনহেগেন, বার্লিন, অসলো, গ্যাটউইক, ব্রাসেলস, মিলান, জেনেভা, লিওঁসহ আরও বহু বিমানবন্দর এই সংকটে আক্রান্ত)
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বিমান সংস্থা
কেএলএম: রয়্যাল ডাচ এয়ারলাইনস ‘কেএলএম’- এর বাতিল হয়েছে ২০৭ এবং বিলম্ব হয়েছে ৩৩৪টি ফ্লাইট। ইউরোপ ও বিশ্বের বিভিন্ন গন্তব্যে সংযোগ ফ্লাইট মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
ইজি জেট: স্বল্পমূল্যের ব্রিটিশ এয়ারলাইন ‘ইজি জেট’-এর বাতিল হয়েছে ৫০ এবং বিলম্ব হয়েছে ৫২টি ফ্লাইট। স্বল্পমূল্যের এই এয়ারলাইনের যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
এয়ার ফ্লান্স: ফ্রান্সের জাতীয় বিমান সংস্থা এয়ার ফ্রান্স-এর বাতিল হয়েছে ২৬ এবং বিলম্ব হয়েছে ২টি ফ্লাইট। সংযোগ ফ্লাইটের যাত্রীদের জন্য জটিলতা তৈরি হয়েছে।
লুফথানসা: জার্মানির জাতীয় এয়ারলাইন-লুফথানসা’র বাতিল হয়েছে ১ এবং বিলম্ব হয়েছে ১০টি ফ্লাইট। সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও আন্তর্জাতিক সংযোগে প্রভাব পড়েছে।
যাত্রীদের জন্য করণীয়
ফ্লাইটের তথ্য নিয়মিত যাচাই করতে হবে। এয়ারলাইনের ওয়েবসাইট বা মোবাইল অ্যাপ দেখা এবং এসএমএস ও ই-মেইল নোটিফিকেশন চালু রাখা জরুরী। এয়ারলাইনের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করার পাশাপাশি বাতিল বা বিলম্ব হলে পুনরায় টিকিট বা ক্ষতিপূরণ সম্পর্কে জেনে রাখা ভালো।
ইউরোপজুড়ে এই ব্যাপক ফ্লাইট বাতিল ও বিলম্ব এভিয়েশনখাতের চলমান সংকটকে স্পষ্ট ভাবে তুলে ধরছে। হাজার হাজার যাত্রী অনিশ্চয়তায় পড়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ইউরোপের পর্যটন শিল্পের পূর্ণ পুনরুদ্ধার আরও বিলম্বিত হতে পারে। আপাতত যাত্রীদের সতর্ক থাকা এবং ভ্রমণ পরিকল্পনায় নমনীয়তা বজায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।


