আর্কটিক অঞ্চলের বরফঢাকা দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত এই অঞ্চলটি দখলে প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছে হোয়াইট হাউস। যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণা আটলান্টিকের দুই পাড়ের মিত্রদের মধ্যে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক ফাটল তৈরি করেছে।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) এক প্রেস ব্রিফিংয়ে হোয়াইট হাউস জানায়…
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ‘অপরিহার্য’ বলে মনে করছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর মেরু অঞ্চলে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি এবং চীনের ‘পোলার সিল্ক রোড’ নীতির মোকাবিলা করতে গ্রিনল্যান্ডকে ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি।
প্রেসিডেন্টের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়…
লক্ষ্য অর্জনে যুক্তরাষ্ট্র সব ধরনের বিকল্প বিবেচনা করছে, যার মধ্যে সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়টিও রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রাসী মনোভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইউরোপের শক্তিশালী দেশগুলো। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, স্পেন ও নেদারল্যান্ডস, এই ছয়টি দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়…
গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একচ্ছত্র অধিকার কেবল সেখানকার জনগণ এবং ডেনমার্কের। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে কোনো সার্বভৌম অঞ্চলের অখণ্ডতায় আঘাত হানা গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি তার ন্যাটো মিত্র ডেনমার্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে, তবে সামরিক জোট ন্যাটোর অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে।
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছেন যে, গ্রিনল্যান্ড কোনো পণ্য নয়। তিনি বলেন…
আমরা সম্মানজনক সংলাপে বিশ্বাসী। তবে যেকোনো আলোচনা হতে হবে আন্তর্জাতিক আইন ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান জানিয়ে।
ডেনমার্ক সরকারও সাফ জানিয়ে দিয়েছে, গ্রিনল্যান্ড বিক্রির কোনো সুযোগ নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই মরিয়া হওয়ার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমটি হলো, গ্রিনল্যান্ডে নিওডিয়ামিয়াম এবং প্রাসেওডিয়ামিয়ামের মতো বিরল খনিজ রয়েছে, যা হাই-টেক ইলেকট্রনিক্স এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য অপরিহার্য। বর্তমানে এর বাজারে চীনের একচেটিয়া আধিপত্য রয়েছে। দ্বিতীয়টি, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফ গলে যাওয়ায় উত্তর মেরু দিয়ে নতুন ও সংক্ষিপ্ত নৌপথ উন্মুক্ত হচ্ছে, যা বিশ্ব বাণিজ্যে বিপ্লব ঘটাবে। এছাড়া, গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের ‘থুলে এয়ার বেস’ রয়েছে। দ্বীপটি নিজের দখলে থাকলে পুরো আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমের ওপর নজরদারি সহজ হবে।
আন্তর্জাতিক মহলে এখন বড় প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র ডেনমার্কের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেবে? নাকি এটি কেবল একটি ‘বড় ডিল’ করার জন্য মনস্তাত্ত্বিক চাপ?
রাশিয়া এবং চীন ইতিমধ্যেই এই ইস্যুতে নজর রাখছে। ক্রেমলিন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে…
আর্কটিক অঞ্চলে যেকোনো ধরনের একতরফা সামরিক তৎপরতা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ২০২৬ সালের এই শুরুটা বিশ্ব রাজনীতির জন্য এক বিপজ্জনক মোড়। যদি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হয়, তবে শীতল যুদ্ধের পর বিশ্ব হয়তো আরও একটি বড় সংকটের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।


