দ্বীপ রাষ্ট্র মাল্টা সম্প্রতি ভূমধ্যসাগরে ডুবে যাওয়া একটি নৌকা থেকে উদ্ধার হওয়া ৪৪ বাংলাদেশি অভিবাসীকে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে। এটি মাত্র ১৭ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হওয়া একটি নজিরবিহীন ফেরত প্রক্রিয়া, যা সাধারণত মাস বা বছর পর্যন্ত সময় নেয়।
মাল্টার সংবাদমাধ্যম ‘মাল্টা ইনডিপেনডেন্ট’ জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া অভিবাসীদের মধ্যে ২৮ ডিসেম্বর রাতে ৪৪ জনকে বিশেষ ফ্লাইটের মাধ্যমে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের ইমিগ্রেশন পুলিশ শাখা নিশ্চিত করেছে, ফ্লাইট নম্বর ‘সিএনডি ৯১৩৫’ বিকাল ৫:২০ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেঅবতরণ করে। দেশে ফেরত আসা সবাই পুরুষ, এবং এই প্রক্রিয়াটি স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন হিসেবে সম্পন্ন হয়েছে, কোনও জোরপূর্বক ডিপোর্টেশন নয়।
ভূমধ্যসাগরে উদ্ধার অভিযান
এই অভিবাসীরা ১২ ডিসেম্বর মাল্টার উপকূলে ডুবে যাওয়া নৌকা থেকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার অভিযান চালানো হয় আর্মড ফোর্স অব মাল্টা বা মাল্টার সশস্ত্র বাহিনীর একটি দল দ্বারা। নৌকায় থাকা মোট ৬১ জনের মধ্যে ৫৯ জন বাংলাদেশি এবং ২ জন মিশরের নাগরিক ছিলেন। উদ্ধারকালে দুইজনের অবস্থা গুরুতর ছিল, হেলিকপ্টারের সাহায্যে তাদের হাসপাতালে পাঠানো হয়, তবে একজন মারা যান।
মাল্টার কর্তৃপক্ষ এই উদ্ধারকাজকে সহায়ক ও মানবিক উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে দ্রুতগতিতে অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো সম্ভব, যা সাধারণত নথি যাচাই, পরিচয় নিশ্চিতকরণ এবং উৎস দেশের সঙ্গে সমন্বয়ের কারণে মাসের পর মাস সময় নেয়।
স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন এবং বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা
মাল্টায় বাংলাদেশের কোনো দূতাবাস নেই। তবে গ্রিসের এথেন্সে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস অনাবাসিক দূতাবাস হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। এথেন্সে বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি রাবেয়া বেগম নিশ্চিত করেছেন, ফেরত আসা অভিবাসীরা সবাই নিজ ইচ্ছায় দেশে ফিরে গেছেন।
বাংলাদেশিরা সবাই নিজ দেশে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন। তাদের মধ্যে একজনও থাকতে চাননি। এটি জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো হয়নি। মাল্টা সরকার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নিয়েছে এবং সহযোগিতা করেছে।
রাবেয়া বেগম আরও জানিয়েছেন, মাল্টা সরকার কিছু আর্থিক সহযোগিতাও করেছে। তবে পরিমাণ প্রকাশ করা হয়নি। বর্তমানে কিছু বাংলাদেশি এখনও মাল্টায় অবস্থান করছেন। যারা যেতে চাননি, তাদেরকে জোরপূর্বক পাঠানো হবে না। একজন অপ্রাপ্তবয়স্ককেও দেশে ফেরানো হয়নি।
দ্রুত ফেরত প্রক্রিয়ার কারণ
ইউরোপিয়ান ট্র্যাভেল অ্যান্ড আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম জানায়, এত দ্রুত ফেরত পাঠানো একটি ব্যতিক্রম। সাধারণত ডিপোর্ট বা প্রত্যাবাসনে মাস বা বছর সময় লাগে, কারণ কাগজপত্র যাচাই, পরিচয় নিশ্চিতকরণ এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়।
মাল্টার সরকার জানিয়েছে, পুলিশ, স্বরাষ্ট্র, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং পররাষ্ট্র ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে এটি সম্ভব হয়েছে।
২০২৫ সালে মাল্টায় আসা অনিয়মিত অভিবাসীদের ৮১% তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। মাল্টা ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে অনিয়মিত আগমনের হার সবচেয়ে কম রাখার ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। গত পাঁচ বছরে মাল্টায় অনিয়মিত অভিবাসীর আগমন ৯৩% কমেছে।
মাল্টার কঠোর নীতি
মাল্টার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাইরন ক্যামিলেরি জানিয়েছেন, যারা শরণার্থী হিসেবে সুরক্ষার যোগ্য তাদেরকে সহায়তা দেওয়া হয়, আর যারা ব্যবস্থার অপব্যবহার করে তাদের দ্রুত ফেরত পাঠানো হয়। তিনি বলেন, দ্রুত ফেরত পাঠানো একটি শক্ত বার্তা দেয় যে, মানবপাচারকারীদের ব্যবসায়িক মডেলকে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে।
ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ ও প্রযুক্তি
মাল্টা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য দেশে নতুন এন্ট্রি ও এক্সিট সিস্টেম গত ১২ অক্টোবর চালু হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলের মধ্যে পুরোপুরি কার্যকর হবে। এটি আঙুলের ছাপ ও মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে অননুমোদিত প্রবেশকারীদের শনাক্ত ও নজরদারি সহজ করবে।
মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
যদিও মাল্টা সরকার মানবিকভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেছে, তবে বিভিন্ন এনজিও এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটি ভূমধ্যসাগরে মাল্টার সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মাল্টা উদ্ধারকাজ লিবিয়ার কোস্ট গার্ডের কাছে স্থানান্তর করেছে, যার ফলে অনেক অভিবাসী লিবিয়ায় ফেরত পাঠানো হচ্ছে, যেখানে আটক, নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের ঘটনাগুলো ব্যাপক।
১৭ দিনের মধ্যে মাল্টা থেকে দেশে ফিরে আসা ৪৪ জন বাংলাদেশির ঘটনা একটি নজিরবিহীন স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন। এটি দেখায় যে, প্রবাসী ও অনিয়মিত অভিবাসীদের জন্য দ্রুত, স্বচ্ছ ও মানবিক ফেরত প্রক্রিয়া সম্ভব। তবে মানবাধিকার সংক্রান্ত উদ্বেগ, অনিশ্চিত আশ্রয় প্রক্রিয়া এবং বিদেশি নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চয়তা নিয়ে প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত রয়েছে।


