ইউরোপজুড়ে যখন ডানপন্থি রাজনীতির চাপে অভিবাসনবিরোধী কঠোর নীতি জোরালো হচ্ছে, ঠিক সেই সময় স্পেন অভিবাসন ইস্যুতে একটি ভিন্ন ও উন্মুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন…
অভিবাসন বিষয়ে তার দেশের নীতি শুধু কার্যকরই নয়, বরং এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জন্য একটি অনুসরণযোগ্য মডেল হতে পারে।
সম্প্রতি মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত স্পেনের রাষ্ট্রদূতদের এক সমাবেশে সমাজতান্ত্রিক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন…
অভিবাসন আমাদের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে, সামাজিক নিরাপত্তা তহবিলকে স্থিতিশীল করেছে এবং শ্রমবাজারে ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
পেদ্রো সানচেজের মতে, গত ছয় বছরে স্পেনের মোট অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রায় ৮০ শতাংশই এসেছে অভিবাসীদের অবদান থেকে। পাশাপাশি, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে যে আয় হয়, তার ১০ শতাংশের উৎস অভিবাসীরা। তিনি বলেন, বার্ধক্যজনিত সংকটে থাকা ইউরোপের জন্য এই বাস্তবতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইউরোপের বহু দেশে জন্মহার কমে যাওয়া ও কর্মক্ষম জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় শ্রমবাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। স্পেন এই বাস্তবতাকে মাথায় রেখে আইনসম্মত অভিবাসনের পথ সহজ করছে, যাতে বিদেশি শ্রমিকরা বৈধভাবে বসবাস ও কাজ করার সুযোগ পান।
তবে স্পেনের এই অভিবাসনপন্থি অবস্থানকে ঘিরে সমালোচনাও রয়েছে। দেশটির বিরোধী ডানপন্থি দলগুলো দাবি করে আসছে, স্পেনের তুলনামূলক উদার নীতি অনিয়মিত অভিবাসীদের আকৃষ্ট করছে, যাকে তারা ‘পুল ইফেক্ট’ বলে অভিহিত করে।
এই অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী সানচেজ। তিনি বলেন…
বাস্তবতা হলো, আমাদের মডেলটি কাজ করছে। ‘পুল ইফেক্ট’ বলে কিছু নেই।
সরকারি পরিসংখ্যানও তার বক্তব্যকে সমর্থন করছে। স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় অনিয়মিত অভিবাসন কমেছে ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ। ওই বছরে স্পেনে অনিয়মিতভাবে প্রবেশ করেছে ৩৬ হাজার ৭৭৫ জন অভিবাসী।
বিশেষ করে আটলান্টিক মহাসাগরীয় অভিবাসন রুট ব্যবহার করে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানো অভিবাসীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় এই পতন ঘটেছে।
অনিয়মিত অভিবাসন কমাতে স্পেন শুধু সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেনি, বরং মানবপাচার নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আফ্রিকার কয়েকটি দেশের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি করেছে। এসব চুক্তির মাধ্যমে উৎস দেশগুলোতে নজরদারি বাড়ানো, তথ্য আদান–প্রদান এবং মানবপাচার চক্র ভাঙার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ স্পেন ২০২১ সাল থেকে ইউরোজোনের অন্যান্য সদস্য দেশের তুলনায় তুলনামূলক ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়ে আসছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে স্পেনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২ দশমিক ৯ শতাংশ, যা ইউরোজোনে প্রত্যাশিত গড় প্রবৃদ্ধির তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈধ অভিবাসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শ্রমবাজারে সক্রিয় অংশগ্রহণ এই প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
পেদ্রো সানচেজ বলেন…
স্পেন এমন একটি অভিবাসন মডেল অনুসরণ করছে, যা মানবিক, বাস্তবসম্মত এবং অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর। এটি ইউরোপকে শুধু অভিবাসন সংকট মোকাবিলায় নয়, বরং ভবিষ্যতের জনসংখ্যাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়ও সহায়তা করতে পারে।
ইউরোপ যখন অভিবাসন প্রশ্নে বিভক্ত, তখন স্পেনের অভিজ্ঞতা নতুন করে ইইউজুড়ে নীতিনির্ধারণী বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।


