মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তার দেশের শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের গ্রিনল্যান্ডে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন, এমন চাঞ্চল্যকর দাবি করেছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম ডেইলি মেইল। শনিবার (১০ জানুয়ারি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে পেন্টাগন ও মার্কিন নিরাপত্তা প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক অজ্ঞাতনামা সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি ভূ-কৌশলগত স্বার্থ, আর্কটিক অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার এবং প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ঠেকানোর অজুহাতে ট্রাম্প প্রশাসন গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে আগ্রাসী কৌশল বিবেচনা করছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা শুধু ইউরোপ নয়, পুরো পশ্চিমা সামরিক জোট ব্যবস্থাকে গভীর সংকটে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
গ্রিনল্যান্ড বর্তমানে ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। ডেনমার্ক ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অন্যতম। ফলে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপ ন্যাটোর ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা হবে। ন্যাটোর মূল নীতির একটি হলো, জোটের কোনো সদস্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহার না করা।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়, তাহলে তা কার্যত ন্যাটোর সংবিধান ভঙ্গের শামিল হবে এবং জোটটির অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। কেউ কেউ এটিকে ন্যাটোর আত্মহত্যামূলক পদক্ষেপ বলেও আখ্যা দিয়েছেন।
বিশাল আয়তনের বরফাচ্ছাদিত দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক শক্তিগুলোর নজরে রয়েছে। আর্কটিক অঞ্চলে এর ভৌগোলিক অবস্থান একে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের থুলে এয়ার বেস নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যা ব্যালিস্টিক মিসাইল সতর্কতা ব্যবস্থা, মহাকাশ নজরদারি ও উত্তর মেরু অঞ্চলে সামরিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফ গলতে থাকায় আর্কটিকে নতুন নৌপথ ও প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনাও বাড়ছে, যা এই অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রহ নতুন নয়। ২০১৯ সালে তিনি প্রকাশ্যেই গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সে সময় ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী এই প্রস্তাবকে অবাস্তব ও হাস্যকর বলে প্রত্যাখ্যান করেন। গ্রিনল্যান্ড কর্তৃপক্ষও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, দ্বীপটি বিক্রির কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
তবে ডেইলি মেইলের দাবি অনুযায়ী, কূটনৈতিকভাবে ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে কঠোর বিকল্প নিয়ে আলোচনা শুরু হয়, যারই অংশ হিসেবে সামরিক পরিকল্পনার বিষয়টি সামনে এসেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিষয়টি ফাঁস হওয়ার পর ইউরোপীয় কূটনৈতিক মহলে তীব্র উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ডেনমার্ক, জার্মানি ও ফ্রান্সের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এটিকে ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক সম্পর্কের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন।
যদিও এখন পর্যন্ত ডেনমার্ক সরকার আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি, তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, কোপেনহেগেন ও ব্রাসেলসে বিষয়টি নিয়ে জরুরি বৈঠক ও পর্যালোচনা চলছে।
এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস বা পেন্টাগনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি। মার্কিন প্রশাসনের এই নীরবতা জল্পনা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এটি ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য ফাঁস করে ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার কৌশলও হতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই পরিকল্পনা বাস্তব রূপ নেয়, তাহলে তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি করবে। ন্যাটোর ভাঙন ঘটলে ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় শূন্যতা সৃষ্টি হবে, যা রাশিয়া ও চীনের মতো শক্তিগুলো কাজে লাগাতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ব রাজনীতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে এবং নতুন করে সামরিক মেরুকরণ শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


