ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং যুক্তরাজ্য (ইউকে) ব্রেক্সিট পরবর্তী ‘রিসেট’ চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে। এই চুক্তির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক উঠেছে যে, চুক্তি থেকে কোনো পক্ষ বেরিয়ে গেলে, তাদের জন্য ক্ষতিপূরণের শর্তাবলী কী হবে। ইইউ এমন একটি শর্ত দাবি করেছে যা ক্ষতিপূরণের বিষয়টিকে পরিষ্কারভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছে, বিশেষত যদি কোনো পক্ষ ভবিষ্যতে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায় বা তার শর্ত পরিবর্তন করে।
এই নতুন শর্তকে ইইউ কূটনীতিকরা ‘ফারাজ ক্লজ’ নামে অভিহিত করছেন, যার উদ্দেশ্য ভবিষ্যতে কোনো সরকার যদি ব্রেক্সিট চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায় (যেমন নিক ফারাজ এবং তার সমর্থকদের হুমকির কারণে), তবে ইইউ যেন ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে। ফাইনান্সিয়াল টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, এই শর্তের অন্তর্গত, চুক্তি বাতিল করলে পরবর্তী সময়ে যে সমস্ত সীমান্ত ও অবকাঠামোগত নিয়ন্ত্রণ পুনঃস্থাপন করতে হবে, তার খরচ ওই পক্ষ বহন করবে।
এই ‘ফারাজ ক্লজ’-টি বিশেষভাবে যুক্তরাজ্যের প্রেক্ষিতে প্রযোজ্য হতে পারে, যদি ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যের কোনো সরকার ইউকে-ইইউ স্যানিটারি এবং ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) চুক্তি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়, যেটি বর্তমানে কীর স্টারমার সরকার আলোচনার মধ্যে রয়েছে।
ইইউ ২০২০ সালে ব্রেক্সিটের পর যে ৫.৪ বিলিয়ন ইউরোর (প্রায় ৪.৭ বিলিয়ন পাউন্ড) সমন্বয় রিজার্ভ ফান্ড তৈরি করেছিল, তা মূলত ব্রিটেনের প্রস্থানের ফলে সদস্য দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়ার জন্য। এই ফান্ডের মধ্যে বিশেষ করে সীমান্ত এবং কাস্টমস ব্যবস্থাপনাগুলির জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে, যেমন আয়ারল্যান্ডে ৯২০ মিলিয়ন ইউরো, নেদারল্যান্ডসে ৮০০ মিলিয়ন ইউরো এবং ফ্রান্সে ৬৭২ মিলিয়ন ইউরো।
ফাইনান্সিয়াল টাইমস জানাচ্ছে, ‘ফারাজ ক্লজ’ অনুযায়ী, যদি কোনো পক্ষ চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়, তাহলে ক্ষতিপূরণে অন্তর্ভুক্ত থাকবে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, সরঞ্জাম, প্রাথমিক নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণের খরচ, যেগুলি বিলিয়ন পাউন্ডে পৌঁছাতে পারে।
তবে, যুক্তরাজ্য সূত্রে দাবি করা হয়েছে যে, এই ধরনের একটি ক্লজ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির একটি সাধারণ অংশ এবং এটি দু’পক্ষের জন্যই কার্যকর হবে। অর্থাৎ, যদি ইইউ চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়, তবে যুক্তরাজ্যও ক্ষতিপূরণ পাবে। লেবার দলের একটি সূত্র জানিয়েছে, এক্সিট প্রভিশনস বা প্রস্থান শর্তাবলী আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির একটি সাধারণ অংশ। এধরনের আইনগত ঝুঁকিগুলো গণতান্ত্রিক আঘাত হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবিকভাবে ক্লান্তিকর।
ইউকে ইন আ চেঞ্জিং ইউরোপের পরিচালক আনন্দ মেনন মন্তব্য করেছেন, আমরা অবাক হওয়ার কিছুই দেখছি না যে, ইইউ কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। তারা বুঝে গেছে যে এই চুক্তিগুলো আমাদের চেয়ে তাদের জন্য বেশি প্রয়োজন। তাই তারা প্রতিটি ছাড় খুঁজে বের করতে চাইবে।
এছাড়া, ইউকে এবং ইইউ-এর মধ্যে আলোচনা আরও কিছু জটিল বিষয় নিয়ে চলমান, যেমন এসপিএস (স্যানিটারি এবং ফাইটোস্যানিটারি) চুক্তি এবং কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (সীমান্তে কার্বন পরিবর্ধন ব্যবস্থা)। যদিও লেবার দল আশা করছিল যে তারা এই চুক্তির মধ্যে একটি সুরাহা করতে সক্ষম হবে, তবে বিষয়টি এখনো সম্পূর্ণ হয়নি।
ব্রেক্সিটের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোতে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং কাস্টমস ব্যবস্থাপনা বাড়ানোর জন্য বিপুল পরিমাণ কর্মী নিয়োগ এবং অবকাঠামো স্থাপন করা হয়েছে। ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস এবং স্পেনের মতো দেশগুলো কাস্টমস অফিসার, পশু চিকিত্সক এবং সীমান্ত পুলিশ নিয়োগে ব্যাপক অর্থ ব্যয় করেছে। এর ফলে, ব্রেক্সিটের খরচ ও তার পরবর্তী প্রভাবগুলি বিশ্বের সামনে এসেছে।
এখন, ইউরোপীয় কমিশন এবং যুক্তরাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য আসেনি, তবে ধারণা করা হচ্ছে যে, আলোচনা আরও কিছু সময় ধরে চলতে থাকবে, কারণ প্রতিটি পক্ষই তাদের স্বার্থে সর্বোচ্চ সুবিধা অর্জন করতে চায়।
এটা স্পষ্ট যে, ইইউ এবং যুক্তরাজ্যের মধ্যে ব্রেক্সিট রিসেট চুক্তির আলোচনা শুধুমাত্র বাণিজ্যিক চুক্তি নয়, বরং এটি উভয় পক্ষের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।


