আরেকটি সপ্তাহ, আরেকটি অস্বাভাবিক আবহাওয়া, যে ধরনের পরিস্থিতি একসময় কল্পনার বাইরে ছিল, আজ তা বাস্তবতার অংশ। এই লেখা যখন তৈরি হচ্ছে, তখন যুক্তরাজ্য দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠা এক ঝড় ও ভারী তুষারপাতের কবলে পড়ে কার্যত স্থবির। ‘ওয়েদার বম্ব’ নামে পরিচিত এই ঝড় জনজীবন বিপর্যস্ত করেছে।
একই সময়ে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে, সুমেরু অঞ্চলে, চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, অস্বাভাবিক উষ্ণতার কারণে সেখানে তুষারের বদলে বৃষ্টি হচ্ছে। সেই বৃষ্টির পানি জমে শক্ত বরফের স্তর তৈরি করছে ভূমির ওপর। ফলে বল্গা হরিণেরা তাদের খুর দিয়ে বরফ খুঁড়ে খাবার সংগ্রহ করতে পারছে না। খাদ্যের অভাবে পুরো বাস্তুতন্ত্র হুমকির মুখে।

সুমেরুর মতো প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকা নির্ভর করে সূক্ষ্ম অভিযোজনের ওপর। সেখানে আবহাওয়ার সামান্য পরিবর্তনও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে, শুধু প্রাণিজগতে নয়, মানব সমাজ ও বৈশ্বিক রাজনীতিতেও।
পরিবেশগত সংকট থেকে ক্ষমতার রাজনীতি
দশকের পর দশক ধরে বিজ্ঞানীরা জলবায়ু সংকটের সতর্কবার্তা দিয়ে আসছেন। রাজনীতিকেরা বলছেন সম্ভাব্য ‘জলবায়ু যুদ্ধ’-এর কথা। তাঁদের আশঙ্কা, খরা, বন্যা, দাবানল ও ঝড় মানুষকে বাস্তুচ্যুত করবে এবং ফুরিয়ে আসা জমি, পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য দেশগুলো একে অপরের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে।
অনেকেই ভেবেছিলেন, এই সংকট হয়তো আঘাত হানবে দূরের কোনো মরুভূমি বা সমুদ্রে ডুবে যেতে থাকা প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপে। নাতিশীতোষ্ণ ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকা তুলনামূলক নিরাপদ থাকবে। কিন্তু গ্রিনল্যান্ড নিয়ে হোয়াইট হাউসের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। জলবায়ু সংকট এখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়। এটি ইতিমধ্যেই ভূরাজনীতির কেন্দ্রে ঢুকে পড়েছে।
নতুন মানচিত্র, নতুন প্রতিযোগিতা

যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা জেনারেল স্যার গুইন জেনকিন্স বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন…
উত্তর মেরুতে বরফ গলে যাওয়ার অর্থ সেখানে এক তীব্র প্রতিযোগিতার সূচনা। এই প্রতিযোগিতা কেবল প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য নয়, বরং ভূখণ্ড, সামরিক উপস্থিতি এবং কৌশলগত নৌপথ নিয়েও।
বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৪০-এর দশকের শুরুর দিকেই গ্রীষ্মকালে সুমেরু মহাসাগরের বড় অংশ প্রায় বরফমুক্ত হয়ে যাবে। এর ফলে এশিয়া থেকে উত্তর আমেরিকায় যাওয়ার একটি নতুন সংক্ষিপ্ত নৌপথ খুলে যেতে পারে। এই পথ বাণিজ্য, জাহাজ চলাচল ও মৎস্য আহরণের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করবে। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, এই একই পথ সামরিক আক্রমণের জন্যও উন্মুক্ত হয়ে যাবে। যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনের চলাচল সহজ হবে, যা উত্তর ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার নিরাপত্তার জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গ্রিনল্যান্ড কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হলেও এর ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক সম্পদ একে বৈশ্বিক শক্তির রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বরফে ঢাকা এই ভূখণ্ডে রয়েছে বিপুল তেল ও গ্যাসের সম্ভাবনা, তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিরল খনিজ পদার্থ। এই খনিজগুলো ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তি কার্যত অচল, ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যাটারি, স্মার্টফোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ডেটা সেন্টার, এমনকি আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম, সবকিছুর কেন্দ্রেই রয়েছে এসব খনিজ।

চীনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এই সম্পদগুলো কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক যেমন একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য মালয়ের রাবার বা ভারতের তুলা ছিল অপরিহার্য, আজকের বিশ্বে তেমনই ভূমিকা রাখছে গ্রিনল্যান্ডের ভূগর্ভস্থ সম্পদ। বরফ গলার সঙ্গে সঙ্গে সেই সম্পদে পৌঁছানো সহজ হচ্ছে, আর সেখানেই শুরু হচ্ছে নতুন লড়াই।
ট্রাম্পের আগ্রহের কারণ
ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক আচরণ অনেক সময় উদ্ভট মনে হয়। ইউক্রেনে নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে বিরল খনিজের অধিকার চাওয়া কিংবা গাজায় ধ্বংসস্তূপের ওপর হোটেল তৈরির কল্পনা, এসব তার উদাহরণ। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তাঁর আগ্রহও প্রথমে অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। তবে গভীরে গেলে দেখা যায়, এর পেছনে রয়েছে সম্পদ, নিরাপত্তা ও আধিপত্যের হিসাব।
ট্রাম্প সম্প্রতি অভিযোগ করেছন…
গ্রিনল্যান্ডের আশপাশের সমুদ্র ‘চীনা ও রুশ জাহাজে ভর্তি’।
বক্তব্যটি যতটা না তথ্যভিত্তিক, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক। তবে এতে স্পষ্ট, তিনি চান না এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বীরা এগিয়ে যাক। সাবেক আবাসন ব্যবসায়ী হিসেবে ‘অব্যবহৃত জমি’ ও ‘ভবিষ্যৎ উন্নয়ন’, এই ধারণাগুলো ট্রাম্পের কাছে খুবই সহজবোধ্য। বরফ গলার অর্থ তাঁর চোখে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার।
কেনা না কি নিয়ন্ত্রণ
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্পষ্ট করে বলেছেন…
যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য গ্রিনল্যান্ড আক্রমণ করা নয়, বরং কিনে নেওয়া, অথবা অন্তত একচেটিয়া সামরিক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। ডেনমার্ক জানিয়েছে…
যুক্তরাষ্ট্র চাইলে সেখানে আরও সেনা মোতায়েন করতে পারে।
তবু মালিকানা মানেই সম্পদের ওপর সরাসরি অধিকার, যা ওয়াশিংটনের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। এই অবস্থান ইউরোপের অনেকের কাছে নতুন সাম্রাজ্যবাদের ইঙ্গিত বহন করে।
কারা সবচেয়ে ঝুঁকিতে

এই শক্তির খেলায় সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছে গ্রিনল্যান্ডের সাধারণ মানুষ ও প্রান-প্রকৃতি। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অন্যদিকে পরাশক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন, দুটোর মাঝখানে তারা কেবলই ঘুঁটি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায়। ট্রাম্পের মনোযোগ যে দ্রুত বদলায়, তা সুবিদিত। গ্রিনল্যান্ড হয়তো একসময় তাঁর আগ্রহ হারাবে। আবার হতে পারে, হোয়াইট হাউস গ্রিনল্যান্ডের ডেনমার্ক থেকে স্বাধীন হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগিয়ে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা উসকে দেবে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে খুব কঠিন নয়।
শেষ কথা
যেটাই হোক, একটি বিষয় পরিষ্কার, এটি কেবল শুরু। উষ্ণ হতে থাকা পৃথিবীতে জমি, পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে। সবচেয়ে বড় মূল্য দেবে প্রান্তিক মানুষগুলো, যাদের জমিতে আর ফসল ফলবে না, যাদের উপকূল ডুবে যাবে, যাদের ঘর ঝড়ে ভেঙে পড়বে। সরকারগুলো যদি জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে এই সংকটকে মানবজাতির যৌথ সমস্যা হিসেবে দেখত, তাহলে হয়তো ভিন্ন কিছু সম্ভব হতো।
কিন্তু আন্তর্জাতিক জলবায়ু উদ্যোগ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে দাঁড়ানো স্পষ্ট করে দেয়, আমরা সেই পৃথিবীতে বাস করছি না। গ্রিনল্যান্ড তাই শুধু একটি দ্বীপ নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, জলবায়ু সংকটের ভূরাজনৈতিক পরিণতি আমরা মাত্র বুঝতে শুরু করেছি। এখনো যা কিছু করার সুযোগ আছে, সেটুকুই আমাদের শেষ ভরসা।


