পর্তুগালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দ্বিতীয় দফা যত এগিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে, এই লড়াই কেবল দুই প্রার্থীর নয়, বরং দুই ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শনের মুখোমুখি সংঘর্ষ। মঙ্গলবারের টেলিভিশন বিতর্কে আন্তোনিও জোসে সেগুরোর একটি বক্তব্য পুরো আলোচনাকে নতুন মাত্রা দেয়। রাজনীতি ছাড়ার সময় প্রায় ৩ লাখ ইউরো ভর্তুকি পাওয়ার অধিকার থাকা সত্ত্বেও তা না নেওয়ার দাবি তুলে ধরে তিনি রাজনীতির নৈতিকতা ও ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধের প্রশ্ন সামনে আনেন।
‘না নেওয়ার রাজনীতি’ বনাম ‘ব্যবস্থা বদলের রাজনীতি’
সেগুরোর বক্তব্য, আমি চাইনি, নিজের জীবনে ফিরে গেছি, শুধু একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ঘোষণা নয়, এটি মূলত প্রচলিত রাজনৈতিক শ্রেণির বিরুদ্ধে ওঠা জনঅসন্তোষের জবাব দেওয়ার এক কৌশল। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, রাজনীতিবিদ মানেই সুবিধাভোগী, এই ধারণা সবার ক্ষেত্রে সত্য নয়। তাঁর যুক্তি অনুযায়ী, সমস্যাটি সংবিধানে নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও ব্যক্তিগত আচরণে।
অন্যদিকে, আন্দ্রে ভেন্তুরা একই ইস্যুকে ব্যবহার করছেন সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে। তাঁর কাছে ব্যক্তিগত ত্যাগ যথেষ্ট নয়, তিনি দাবি করছেন কাঠামোগত পরিবর্তন। আজীবন ভর্তুকি বাতিলের প্রশ্নে ভেন্তুরার অবস্থান মূলত তাঁর পরিচিত ‘অ্যান্টি-সিস্টেম’ রাজনীতিরই ধারাবাহিকতা, যেখানে প্রচলিত প্রতিষ্ঠান ও আইনকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা হয়।
সংবিধান: প্রতীক নাকি বাস্তব সমস্যা
সংবিধান পরিবর্তনের প্রশ্নটি এখানে প্রতীকী গুরুত্ব বহন করছে। সেগুরোর মতে, সংবিধান এমন একটি সামাজিক চুক্তি, যা বারবার রাজনৈতিক চাপের মুখে বদলানো উচিত নয়। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক দুর্নীতি বা সুবিধাভোগিতা দূর করতে চাইলে আইন প্রয়োগ ও নৈতিক নেতৃত্বই যথেষ্ট।
ভেন্তুরা ঠিক উল্টো ছবি আঁকছেন। তাঁর যুক্তি, সংবিধান নিজেই এমন কিছু সুবিধা ও সুরক্ষা দেয়, যা রাজনৈতিক এলিটদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ তৈরি করে। তাই জনগণের আস্থা ফেরাতে সংবিধান সংশোধন জরুরি। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি অসন্তুষ্ট ভোটারদের ক্ষোভকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দিকে সরিয়ে দিতে চাইছেন।
বিতর্কের মঞ্চ ও প্রতীকী বার্তা
৭৫ মিনিটের এই বিতর্কটি কেবল প্রশ্নোত্তরের অনুষ্ঠান ছিল না, এটি ছিল ভোটারদের উদ্দেশে প্রতীকী বার্তার লড়াই। লিসবনের মিউজিয়াম অব ডিজাইনের মতো একটি আধুনিক ও সাংস্কৃতিক স্থানে বিতর্ক আয়োজন নিজেই একটি বার্তা দেয়, পর্তুগাল পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
আরটিপি, এসআইসি ও টিভিআই–এর যৌথ সম্প্রচার বিতর্কটির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তোলে। সঞ্চালকদের প্রশ্নে বারবার ফিরে এসেছে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা, সামাজিক বিভাজন ও রাজনৈতিক আস্থাহীনতার বিষয়গুলো, যা বর্তমান পর্তুগিজ রাজনীতির কেন্দ্রীয় সংকট।
ভোটের অঙ্ক ও ঝুঁকি
প্রথম দফার ফলাফল সেগুরোকে এগিয়ে রাখলেও ব্যবধান খুব বেশি নয়। ৩১.১১ শতাংশ বনাম ২৩.৫২ শতাংশ ভোটের ব্যবধান দ্বিতীয় দফায় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। বিশেষ করে যারা প্রথম দফায় ভোট দেননি বা ছোট প্রার্থীদের সমর্থন করেছিলেন, তাঁদের ভোটই চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করবে। এখানেই ভর্তুকি ও সংবিধান বিতর্কের রাজনৈতিক তাৎপর্য সবচেয়ে বেশি। একদিকে সেগুরো চেষ্টা করছেন মধ্যপন্থী ও প্রাতিষ্ঠানিক ভোটারদের আশ্বস্ত করতে, অন্যদিকে ভেন্তুরা ক্ষুব্ধ, অসন্তুষ্ট ও ‘সিস্টেম-বিরোধী’ ভোটারদের একত্র করতে চাইছেন।
রাষ্ট্রপতির ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ
পর্তুগালের রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে সরাসরি সরকার পরিচালনা না করলেও, তাঁর নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব গভীর। এই নির্বাচনে তাই প্রশ্নটি কেবল কে জিতবে তা নয়, বরং পরবর্তী দশকে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় কোন বার্তা বহন করবে। সেগুরো যদি জয়ী হন, তাহলে তা হবে স্থিতিশীলতা, ধারাবাহিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির পক্ষে এক ধরনের গণরায়। আর ভেন্তুরার জয় মানে হবে প্রতিবাদী রাজনীতির মূলধারায় প্রবেশ এবং সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো নিয়ে নতুন সংঘাতের সূচনা।
৩ লাখ ইউরো ভর্তুকি না নেওয়ার দাবিটি তাই নিছক একটি ব্যক্তিগত গল্প নয়। এটি পর্তুগালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বৃহত্তর প্রশ্নগুলোর প্রতীক। ক্ষমতা বনাম নৈতিকতা, সংস্কার বনাম কাঠামো, এবং স্থিতিশীলতা বনাম পরিবর্তন। দ্বিতীয় দফার ভোটে পর্তুগিজ জনগণ ঠিক করবেন, কোন পথেই এগোবে দেশ।


