দীর্ঘসূত্রতা, ফাইল জট ও বছরের পর বছর অপেক্ষার অবসান ঘটাতে যাচ্ছে ইতালি। নাগরিকত্ব আইন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) সংস্কার আনছে দেশটির সরকার। ২০২৬ সালের নতুন বাজেটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষণা দিয়েছে, অভিবাসীদের নাগরিকত্ব প্রক্রিয়া হবে আরও সহজ, দ্রুত, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর। এই সিদ্ধান্তকে ইতালির অভিবাসন নীতিতে এক যুগান্তকারী মোড় হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
নাগরিকত্ব প্রক্রিয়ায় যা বদলাচ্ছে
এতদিন নাগরিকত্বের আবেদন এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ঘুরতে ঘুরতে ৩–৪ বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যেত। নতুন ব্যবস্থায়, জাতীয় বাসিন্দা জনসংখ্যা নিবন্ধন ব্যবস্থা-এএনপিআর ডিজিটাল সিস্টেমের মাধ্যমে, আবেদন জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য যাচাই শুরু হবে, ফলে কাগজপত্র হারিয়ে যাওয়া বা ফাইল আটকে থাকার ঝুঁকি অনেকটাই কমবে।
নাগরিকত্ব প্রক্রিয়ায় প্রথমবারের মতো ‘এআই’ ব্যবহার করতে যাচ্ছে ইতালি। বিশেষ করে, যারা ইতালিতে টানা ১০ বছর বৈধভাবে বসবাস করে নাগরিকত্বের আবেদন করেছেন, যাদের ফাইল শুধু প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে আছে, তাদের ডাটা যাচাই, সময় গণনা ও ডকুমেন্ট মিলিয়ে দেখার কাজ করবে এআই সিস্টেম। এর ফলে, অযথা ফাইল পড়ে থাকার আশঙ্কা কমবে, মানবিক ভুল কমে আসবে এবং আবেদন নিষ্পত্তির সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
নতুন আইনে অভিবাসী পরিবারগুলোর জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর রয়েছে। বিদেশে জন্ম নেওয়া শিশুদের নাগরিকত্ব ঘোষণার সময়সীমা ১ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩ বছর করা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে আবেদন ফি সম্পূর্ণ মওকুফ করা হবে। এতে কর্মজীবী অভিবাসী পরিবারগুলো আর সময়সীমা মিস করার ঝুঁকিতে পড়বে না।
ডিজিটাল ইতালি ২০২৬’ প্রকল্পের আওতায় আগামী জুন মাসের মধ্যেই নতুন সিস্টেম পুরোপুরি চালু হওয়ার কথা। নতুন ব্যবস্থায়, আবেদনকারীরা সরকারি ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থা –এসপিআইডি বা ইলেকট্রনিক পরিচয়পত্র-সিআইই ব্যবহার করে, স্মার্টফোন বা কম্পিউটার থেকে পাসপোর্ট আবেদনের মতোই নাগরিকত্ব আবেদনের প্রতিটি ধাপ লাইভ ট্র্যাক করতে পারবেন। কোন ফাইল কোন পর্যায়ে আছে, কতদিন লাগতে পারে, সবকিছু থাকবে এক ক্লিকে। ইতালি বর্তমানে একদিকে যেমন জনসংখ্যা সংকট, অন্যদিকে শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি মোকাবিলা করছে।
সরকারের লক্ষ্য, বৈধ ও দীর্ঘদিন বসবাসরত অভিবাসীদের দ্রুত নাগরিকত্ব দিয়ে ইতালির সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূলধারায় যুক্ত করা বিশেষ করে, যারা সিজনাল ভিসায় এসে নিয়ম মেনে কাজ করেছেন, পরবর্তীতে স্থায়ীভাবে বসবাসের পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য এই সংস্কারকে সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইতালিতে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকত্বের ফাইল জট ও অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। এই ডিজিটাল রিফর্মের ফলে, অপেক্ষার সময় কমবে, দালালনির্ভরতা হ্রাস পাবে ও প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু প্রশাসনিক সংস্কার নয়, বরং অভিবাসীদের প্রতি ইতালির আস্থা ও অন্তর্ভুক্তির বার্তা।
এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে নাগরিকত্ব প্রক্রিয়া দ্রুত করার এই উদ্যোগ ইতালিকে ইউরোপের অন্যতম অভিবাসীবান্ধব ও আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরতে পারে। তবে সবকিছু নির্ভর করবে, বাস্তব প্রয়োগ, ডাটা সুরক্ষা এবং প্রশাসনিক সদিচ্ছার ওপর।
যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন হয়, তাহলে এটি হাজারো অভিবাসীর জন্য সত্যিকার অর্থেই নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।


