পশ্চিম ইউরোপের এই ছোট দেশটি সাম্প্রতিক সময়ে অভাবনীয় এক ঝড় ও ভারী বৃষ্টির কবলে পড়ে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। দেশটির মধ্যভাগ দিয়ে আছড়ে পড়া ঝড় ‘ক্রিস্টিন’ শুধু মৌসুমী ঝড় ছিল না, এটি স্থলভাগে প্রবেশ করার সময় বাতাসের গতি ঘন্টায় প্রায় ২০০ কিলোমটার ছাড়িয়ে যায়, অকাল বৃষ্টি আর অত্যাধিক ঝড়ো বাতাস দিয়ে এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।
প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি
অন্তত ৬ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে, এবং অনেকে আহত হয়েছেন ঝড়ের তাণ্ডবে। ঝড়ের তীব্র বাতাস এবং ভারী বৃষ্টির ফলে শোডাউনের বড় বড় অংশ, ফ্যাক্টরি, ঘরবাড়ি ও যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাস্তাঘাট অবরুদ্ধ, লাইন লাইন ভেঙেছে, এবং ট্রেন ও পরিবহন পরিষেবা ব্যাপক বিঘ্নিত হয়েছে। শক্তিশালী বাতাসে গাছ উড়ে গেছে, ভবন ভেঙে গেছে এবং অনেক স্থাপনা আংশিক বা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে।
বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা
ঝড়ের সময় লাখ লাখ মানুষের বিদ্যুৎ সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এক পর্যায়ে প্রায় ১ মিলিয়ন গ্রাহক বিদ্যুতহীন ছিল, এবং এখনও অনেক জায়গায় পুরোপুরি পরিস্থিতি স্থির হয়নি। এতে শুধু ঘরবাড়ির আলোই নেভনি, কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক, টেলিভিশন এবং রেডিওও বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে, যা জরুরি সেবা ও উদ্ধারকাজকে জটিল করে তুলেছে।
বৃষ্টি ও বন্যাআশঙ্কা
ঝড়‘ক্রিস্টিন’উত্তর দিকে সরে গেলেও, আবহাওয়া বিভাগ আরও ভারী বৃষ্টি ও বন্যার সতর্কতা জারি করেছে। ইতিমধ্যেই বেশিরভাগ অঞ্চলে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সতর্কতা পাওয়া গেছে এবং নিম্নভূমি অঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি আরও জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে এবং রাস্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরায় বিপাকে পড়েছে। বৃষ্টির কারণে নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে স্থানগুলোতে প্লাবনের শঙ্কা রয়েছে।
জরুরি পরিস্থিতি ও সরকারি উদ্যোগ
পর্তুগাল সরকার ২.৫ বিলিয়ন ইউরো খরচের একটি পুনর্গঠন ও সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও ব্যবসাগুলোকে আর্থিকভাবে সহায়তা করা হবে। প্যাকেজের কিছু মূল দিক, ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও ফ্যাক্টরি পুনর্নির্মাণে ১বিলিয়ন ঋণ প্রোগ্রাম, ব্যবসায়িক তহবিল সহায়তা ও নগদ প্রবাহ বজায় রাখতে ৫০০ মিলিয়ন এবং বাড়ি ও পরিবারিক সহায়তা, ক্ষতিগ্রস্ত ঘর পুনর্নির্মাণ ও সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা। সরকার প্রায় ৬০টি পৌরসভায় কল্যাণ পরিস্থিতি ঘোষণা করেছে, যা আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জারি থাকবে এবং জরুরি ব্যবস্থাপনা দ্রুততর করবে।
স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ক সতর্কবার্তা
পর্তুগালের স্বাস্থ্য বিভাগ জনগণকে সতর্ক করেছে জলের নিরাপত্তা, খাবারের সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার জন্য। বিশেষ করে বিদ্যুৎহীন এলাকায় পানীয় জলের গুণগতমান ও খাদ্যের সঠিক সংরক্ষণ খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অতিরিক্ত বৃষ্টিতে বিপজ্জনক বন্যার পানি শরীর সংস্পর্শে নিয়ে চলাফেরা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। এছাড়া, বিদ্যুৎ না থাকলে বিদ্যুৎ জেনারেটর ব্যবহারের সময় সাবধানতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সময়ের পরিক্রমায় পরিস্থিতি
ঝড়ের মূল প্রভাব কমলেও বাস্তব ক্ষতি এখনও কাটিয়ে উঠা হয়নি। আরও বৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকির কারণে নাগরিকরা সতর্ক ও প্রস্তুত থাকছেন। সরকারের পুনর্গঠন উদ্যোগ ধীরে ধীরে কার্যকর হচ্ছে এবং অবকাঠামো পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে।
পর্তুগালে ঝড় ‘ক্রিস্টিন’ শুধুমাত্র একটি মৌসুমি ঝড় ছিল না, এটি ছিল রেকর্ডভাঙা বাতাস, পথরোধী বৃষ্টি ও ব্যাপক বন্যার এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। দেশের বহু জায়গায় জীবনযাত্রা থমকে গেছে, আর আফটারশক ও বৃষ্টির ত্রাস দেশের মানুষের উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে। বিমানবন্দর, রেলপথ ও রাস্তা খোলার কাজ, বিদ্যুৎ পুনরুদ্ধার এবং নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।


