২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ইরাসমাস মুন্ডাস বৃত্তি বাংলাদেশের আট তরুণ প্রকৌশলীর জীবনকে নতুনভাবে গড়ে দিয়েছে। ফ্রান্সের সন্ত্রাল নঁত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে এই আট শিক্ষার্থী একসঙ্গে পড়ার সুযোগ পান। দেশে তারা একেকজন আলাদা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেছেন, কিন্তু ইউরোপে তাদের গন্তব্য মিলে গেছে একটি সাধারণ স্বপ্নে উন্নত প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক মানের শিক্ষা অর্জনের মধ্য দিয়ে।
ইরাসমাস মুন্ডাস: বিশ্বমানের বৃত্তি
ইরাসমাস মুন্ডাস ইউরোপের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ উচ্চশিক্ষা বৃত্তিগুলোর মধ্যে একটি। প্রতিবছর হাজারো শিক্ষার্থী আবেদন করেন, নির্বাচিত হন হাতে গোনা কিছু। বৃত্তির মূল লক্ষ্য গবেষণা-ভিত্তিক, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং বহুমুখী শিক্ষা। শিক্ষার্থীদের শুধু জিপিএ নয়, গবেষণা অভিজ্ঞতা, একাডেমিক প্রোফাইল ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য বিবেচনা করা হয়। মুশফিকুর রহমান বলেন, এখানে শুধু ভালো সিজিপিএ নয়, আপনাকে দেখাতে হবে কীভাবে নিজের অভিজ্ঞতা ও লক্ষ্যকে বৈশ্বিক সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করছেন।
বাংলাদেশের আট শিক্ষার্থী
এআইইউবি-এর শিক্ষার্থী মুশফিকুর রহমান, খন্দকার মাইনুল ইসলাম ও আবদুল আজিজ। মুশফিকুর রহমান ও আবদুল আজিজ ভর্তি হয়েছেন ইউরোপিয়ান জয়েন্ট মাস্টার্স ইন ইলেকট্রিক ভেহিকল প্রপালশন অ্যান্ড কন্ট্রোল প্রোগামে।এতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের চালক শক্তি বা গতিশক্তি ব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিবহন প্রযুক্তি নিয়ে পড়াশোনা করছেন তারা।
খন্দকার মাইনুল ইসলাম, ভর্তি হয়েছেন ইউরোপিয়ান জয়েন্ট মাস্টার্স ইন ডায়নামিকস অব রিনিউয়েবল-বেইসড পাওয়ার সিস্টেমস প্র্রোগ্রামে। তার বিষয়বস্তু, নবায়নযোগ্য শক্তি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সিস্টেম বিশ্লেষণ করা। এছাড়া অন্যদের মধ্যে রয়েছে, আইউটি’র মো. মনির উদ্দিন ও সানজানা তাবাসসুম, ডিআইইউ’র মো. সাফি, গ্রিন ইউনিভার্সিটির মো. আমিনুল ইসলাম ও এইচএসটিইউ’র মো. শাহরিয়ার রহমান। এই আট শিক্ষার্থী ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসলেও, একসঙ্গে একই প্রোগ্রামে মিলিত হয়েছেন।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগ
ফ্রান্সে নতুন জীবন মানিয়ে নেওয়া কঠিন, কিন্তু একে অপরের সমর্থন বাংলাদেশিদের জন্য বড় শক্তি। একসঙ্গে ক্লাস ও ল্যাব থাকায় সহযোগিতা ও পারস্পরিক শেখার সুযোগ। একসঙ্গে রান্না, শহর ভ্রমণ, বিশেষ অনুষ্ঠান ও সাপ্তাহিক বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ। এই অভিজ্ঞতা ঘনিষ্ঠ কমিউনিটি গড়ে তোলে, যা মানসিক স্বস্তি ও সাংস্কৃতিক সংযোগের প্রমাণ। সানজানা তাবাসসুম বলেন, নতুন দেশ, নতুন সংস্কৃতি কঠিন সময়ে নিজ দেশের মানুষ পাশে থাকাটা বড় শক্তি।
শিক্ষাব্যবস্থা ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের তুলনায় ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থা অনেক গবেষণাকেন্দ্রিক ও বিশ্লেষণধর্মী। লেকচার শুনলেই হয় না; প্রশ্ন করা, যুক্তি তোলা ও নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন বাধ্যতামূলক, অ্যাসাইনমেন্ট ও প্রজেক্ট, দলগত কাজের মাধ্যমে বিশ্লেষণধর্মী চিন্তাশক্তি গড়ে তোলা। এখানে শিক্ষকরা সমাধান দেন না, শিক্ষার্থীদের নিজে থেকে ভাবতে শেখান। মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, এখানে শেখার সবচেয়ে বড় বিষয় হলো নিজে থেকে ভাবতে শেখা। শিক্ষকেরা সমাধান দিয়ে দেন না; আমাদের ভাবতে বাধ্য করেন।
ভাষা ও সাংস্কৃতিক বাধা
অ্যাকাডেমিক কাজ ইংরেজিতে হলেও, দৈনন্দিন জীবনে ফরাসি ভাষার প্রয়োজন, সময়ানুবর্তিতা, পেশাদার মনোভাব ও দায়িত্ববোধ, নতুন জীবনধারার অংশ।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
পরবর্তী সেমিস্টারে জার্মানি, স্পেন, ইতালি, রোমানিয়াসহ ভিন্ন দেশে গবেষণা, শিল্প খাত ও প্রযুক্তি সংযোগের অভিজ্ঞতার সুযোগ। এই অভিজ্ঞতা শুধুমাত্র ডিগ্রি নয়, বৈশ্বিক মানসিকতা ও আন্তর্জাতিক সক্ষমতা গড়ে তুলছে।
বাংলাদেশের গৌরব
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি শুধুমাত্র তাদের ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষার মান ও গবেষণা সক্ষমতার পরিচায়ক। শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক সহপাঠীদের মধ্যে কৌতূহল ও আগ্রহ এবং বাংলাদেশকে চেনার ও গর্বিত করার দায়িত্ব। খন্দকার মাইনুল ইসলাম বলেন, আমাদের কাজ ও পারফরম্যান্সের মাধ্যমেই অনেকে বাংলাদেশকে চিনবে। তাই সর্বোচ্চ চেষ্টা করি।
বিশ্লেষণ ও শিক্ষা
একই প্রোগ্রামে আট শিক্ষার্থী মিলিত হয়ে এক নতুন সামাজিক ও একাডেমিক নেটওয়ার্ক গড়েছেন। গবেষণা-কেন্দ্রিক শিক্ষা ফ্রান্সের শিক্ষাব্যবস্থা বিশ্লেষণ ও দলগত কাজকে গুরুত্ব দেয়। সাংস্কৃতিক অভিযোজনের মাধ্যমে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া, ভাষা, সামাজিক আচরণ ও পেশাদার মনোভাব শেখার সুযোগ। আন্তর্জাতিক মানসিকতা এবং বৈশ্বিক সমস্যা ও প্রযুক্তি সমাধান নিয়ে চিন্তাশক্তি। এছাড়া দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের পরিচয় বহন করা।
বাংলাদেশি তরুণ প্রকৌশলীরা ইরাসমাস মুন্ডাস বৃত্তির মাধ্যমে শিক্ষা, গবেষণা, সামাজিক সংযোগ ও আন্তর্জাতিক দক্ষতা অর্জন করছেন। এই অভিজ্ঞতা শুধুমাত্র তাদের ব্যক্তিগত উন্নতি নয়, এটি বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষার গুণমান, বৈশ্বিক উপস্থিতি এবং প্রবাসীদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ।
এই আট শিক্ষার্থী প্রমাণ করলেন, পরিশ্রম, দৃঢ়তা ও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশি তরুণরা বিশ্বের যে কোনো জায়গায় স্বপ্ন পূরণ করতে পারে।


