ইতালির সমাজ এখন আর আগের মতো একরঙা নয়। অভিবাসন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে দেশটি ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে একটি বহুসাংস্কৃতিক বাস্তবতায়। আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসছে এক তাৎপর্যপূর্ণ সামাজিক প্রবণতা মিক্সড ম্যারিজ বা মিশ্র বিয়ে। এই প্রবণতার ভেতর দিয়ে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে বাংলাদেশি প্রবাসীদের সামাজিক উত্তরণ, গ্রহণযোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ইতালীয় সমাজে একীভূত হওয়ার বাস্তব চিত্র।
সংখ্যার ভাষায় সামাজিক পরিবর্তন
ইতালির জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা (আএসটিএটি)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে মোট বিয়ে হযেছে ১ লাখ ৭৩ হাজার ২৭২টি, মিক্সড ম্যারিজ বা মিশ্র বিয়ে হযেছে ২৯ হাজার ৩০৯টি। মোট হার প্রায় ১৭ শতাংশ। অর্থাৎ, ইতালিতে প্রতি ৬টি বিয়ের মধ্যে ১টি হচ্ছে ভিন্ন জাতি বা ভিন্ন নাগরিকত্বের মানুষের মধ্যে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এটি শুধুই পারিবারিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি গভীর সামাজিক রূপান্তরের সূচক।
যে কারণে আলোচনায় বাংলাদেশিরা
আএসটিএটি–এর মূল রিপোর্টের পাশাপাশি স্কাই টিজি২৪ ও এএনএসএ–র বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এক চমকপ্রদ তথ্য, এশীয় অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই ইতালীয়দের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি বৈবাহিক সম্পর্কে যুক্ত হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা এর পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে, ইতালিতে জন্ম নেওয়া বা ছোটবেলায় আসা দ্বিতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশিরা, সাবলীল ইতালীয় ভাষায় কথা বলেন, ইতালীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় বেড়ে উঠেছেন এবং সংস্কৃতিগত ব্যবধান অনেকটাই ঘুচিয়ে ফেলেছেন। ফলে তাদের সঙ্গে ইতালীয় নাগরিকদের সম্পর্ক গড়ে ওঠা স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।
ইতালীয় সমাজে বাংলাদেশিদের পরিচিতি, পরিশ্রমী, পরিবারকেন্দ্রিক এবং আইন ও সামাজিক নিয়ম মেনে চলা এই বিষয়গুলো ইতালীয় পরিবারগুলোর কাছে বাংলাদেশিদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।
শহর ভিত্তিক বিশ্লেষণ
মিক্সড ম্যারেজের হার সবচেয়ে বেশি মিলান শহরে।কারণ শহরটিতে রয়েছে, আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থান, ফ্যাশন ও মাল্টিকালচারাল পরিবেশ। এরপরে হচ্ছে রোম শহরটি, এটি প্রশাসনিক কেন্দ্র ও শিক্ষার হাব।এছাড়া ভেনিস ও ফ্লোরেন্স পর্যটন, বিশ্ববিদ্যালয় ও সংস্কৃতির বিখ্যাত শহর। এই শহরগুলোতে বাংলাদেশিরা কেবল শ্রমিক নয়, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন।
বয়স, লিঙ্গ ও সামাজিক প্রোফাইল
পরিসংখ্যান বলছে, ২৫–৩৫ বছর বয়সী বাংলাদেশি তরুণরা সবচেয়ে বেশি মিক্সড ম্যারেজে যুক্ত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বর বাংলাদেশি, কনে ইতালীয় নাগরিক। স্থায়ী চাকরি, বৈধ কাগজপত্র ও সামাজিক স্থিতিশীলতা এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। এটি প্রমাণ করে যে মিক্সড ম্যারেজ এখন আর অনিশ্চয়তার সিদ্ধান্ত নয়, বরং পরিকল্পিত ও স্থায়ী পারিবারিক নির্বাচন।
সামাজিক ইন্টিগ্রেশন
এক দশক আগেও ইতালিতে বাংলাদেশিদের পরিচয় ছিল মূলত, “লেবার ফোর্স” হিসেবে। আজ সেই পরিচয় বদলে গিয়ে দাঁড়িয়েছে “সমাজের অংশীদার” হিসেবে। মিক্সড ম্যারেজ এই পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক। কারণ, এটি পারিবারিক পর্যায়ে ইতালীয় সমাজে প্রবেশ, সামাজিক আস্থার স্বীকৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সমান সুযোগের দরজা খুলে দেয়।
নাগরিকত্ব ও আইনি বাস্তবতা
যদিও শুধুমাত্র বিয়ে করলেই নাগরিকত্ব পাওয়া যায় না, তবে স্থায়ী বসবাস, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, এসব ক্ষেত্রে মিক্সড ম্যারেজ ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ কথা স্বীকার করছেন আইন বিশেষজ্ঞরাও।
বহু সাংস্কৃতিক পরিবার
এই বিয়েগুলোর মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে, দ্বিভাষিক সন্তান, দুই সংস্কৃতির সমন্বিত পরিবার এবং ধর্ম, খাদ্য ও ঐতিহ্যের পারস্পরিক শ্রদ্ধা। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই পরিবারগুলিই ভবিষ্যতের ইতালির সামাজিক কাঠামো গড়ে তুলবে।
বাংলাদেশিদের জন্য বার্তা
ইতালিতে বাংলাদেশি প্রবাসীদের এই অর্জন একটি ঐতিহাসিক বার্তা বহন করে। এখানে বাংলাদেশিরা এখন কেবল শ্রমিক নন, বরং ইতালীয় সমাজের স্বীকৃত অংশ। এই স্বীকৃতি এসেছে, সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, শিক্ষা ও আচরণ এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে।
মিক্সড ম্যারিজ বা মিশ্র বিয়ে কোনো হঠাৎ ঘটনা নয়, এটি ইতালিতে বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিনের সামাজিক সংগ্রাম ও অভিযোজনের ফল। এই প্রবণতা প্রমাণ করে, বাংলাদেশি কমিউনিটি ইতালির মূলধারায় স্থায়ী জায়গা করে নিচ্ছে, পরিবার, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাধ্যমে।


