বিশ্ব চলচ্চিত্রের মানচিত্রে বাংলাদেশের উপস্থিতি ধীরে হলেও দৃঢ়ভাবে বিস্তৃত হচ্ছে। সেই যাত্রায় নতুন এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক যুক্ত হলো নেদারল্যান্ডসের মর্যাদাপূর্ণ ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল রটারড্যাম (আইএফএফআর)–এ বাংলাদেশের দুটি চলচ্চিত্র ‘রইদ’ ও ‘মাস্টার’ প্রতিযোগিতামূলক বিভাগে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে। আন্তর্জাতিক এই মঞ্চে জায়গা করে নেওয়াকে দেশের সমসাময়িক সিনেমায় নতুন ভাষা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সাহসী নির্মাণচর্চার স্বীকৃতি হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
১৯৭২ সালে যাত্রা শুরু করা রটারড্যাম চলচ্চিত্র উৎসব মূলত স্বাধীন, শিল্পধর্মী ও পরীক্ষামূলক চলচ্চিত্রের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এখানে মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়, সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা, নতুন ন্যারেটিভ স্টাইল, ভিজ্যুয়াল এক্সপেরিমেন্টেশন এবং সাহসী ও বিকল্প গল্প বলার ভঙ্গি, বিশেষ করে রটারড্যামের প্রতিযোগিতামূলক বিভাগগুলো তরুণ ও উদীয়মান নির্মাতাদের জন্য একটি আন্তর্জাতিক লঞ্চপ্যাড হিসেবে কাজ করে। এমন একটি প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের দুটি ছবি জায়গা করে নেওয়া দেশীয় সিনেমার অগ্রযাত্রার শক্ত প্রমাণ।
চলচ্চিত্র ‘রইদ’ সমকালীন সমাজের প্রান্তিক বাস্তবতা ও মানুষের অভ্যন্তরীণ সংকটকে গভীরভাবে অনুসন্ধান করে। ছবিটির গল্পে মুখ্য হয়ে ওঠে, নিঃসঙ্গতা, অস্তিত্বের লড়াই এবং সময় ও সমাজের চাপে সম্পর্কের ভাঙন। সংলাপনির্ভর বর্ণনার বদলে ‘রইদ’-এ ব্যবহার করা হয়েছে দৃশ্য, আবহসংগীত ও নীরবতার শক্তিশালী ভাষা। ক্যামেরার দীর্ঘ শট, ধীর গতি ও প্রতীকী উপস্থাপনা ছবিটিকে প্রচলিত দেশীয় সিনেমা থেকে আলাদা করেছে। এই ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিংই আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে ছবিটিকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন চলচ্চিত্র বিশ্লেষকেরা।
অন্যদিকে ‘মাস্টার’ চলচ্চিত্রটি ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের মনস্তত্ত্বকে কেন্দ্র করে নির্মিত একটি গভীর ও স্তরবহুল কাজ। ব্যক্তির ভেতরের ভয়, নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে তার সংঘাত, এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই এগিয়েছে ছবিটির কাহিনি।
গল্প বলার ক্ষেত্রে ‘মাস্টার’ প্রচলিত ন্যারেটিভ কাঠামো ভেঙে নতুন এক ফর্ম তৈরি করেছে। ফ্রেম কম্পোজিশন, আলো-ছায়ার ব্যবহার এবং চরিত্রের মনস্তত্ত্বকে দৃশ্যের মাধ্যমে প্রকাশ, সব মিলিয়ে এটি একটি চিন্তাশীল ও চ্যালেঞ্জিং চলচ্চিত্র। এই সাহসী নির্মাণভঙ্গিই রটারড্যামের মতো উৎসবের নজর কেড়েছে।
রটারড্যামের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া মানে শুধু পুরস্কারের দৌড়ে থাকা নয়। এটি, আন্তর্জাতিক সমালোচকদের নজরে আসা, বিশ্বব্যাপী পরিবেশক ও প্রযোজকদের সঙ্গে সংযোগ, ভবিষ্যৎ সহ-প্রযোজনার সম্ভাবনা ও বৈশ্বিক চলচ্চিত্র আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এই স্বীকৃতি নতুন নির্মাতাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং পরবর্তী প্রজন্মকে বিকল্প ধারার সিনেমা নির্মাণে উৎসাহিত করে।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি সিনেমা মূলত বাণিজ্যিক কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে একদল তরুণ নির্মাতা সেই গণ্ডি ভেঙে, উৎসবকেন্দ্রিক সিনেমা, সামাজিক ও মানবিক গল্প, আন্তর্জাতিক দর্শককে লক্ষ্য করে নির্মাণ, এই ধারার সিনেমা নির্মাণে এগিয়ে আসছেন। ‘রইদ’ ও ‘মাস্টার’ সেই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।
রটারড্যাম চলচ্চিত্র উৎসব বরাবরই পরিচিত সাহসী নির্মাতাদের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে। সেখানে বাংলাদেশের দুটি ছবি একসঙ্গে প্রতিযোগিতায় থাকা প্রমাণ করে, দেশীয় সিনেমা এখন কেবল অনুসরণকারী নয়, বরং নিজস্ব ভাষা ও পরিচয় নিয়ে আন্তর্জাতিক সংলাপে অংশ নিচ্ছে।
‘রইদ’ ও ‘মাস্টার’ কেবল দুটি চলচ্চিত্র নয়; এগুলো বাংলাদেশের সিনেমার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দিকনির্দেশনা। এই অর্জন দেখিয়ে দেয়, সাহসী গল্প ও নতুন ভাষা নিয়ে এগোলে বাংলাদেশের সিনেমাও বিশ্ব দরবারে জায়গা করে নিতে পারে।


