টানা শক্তিশালী ঝড়, অতিবৃষ্টি, তুষারপাত ও তীব্র বাতাসে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে ইউরোপের দুই দেশ স্পেন ও পর্তুগাল। আইবেরিয়ান উপদ্বীপজুড়ে কয়েক দিনের বৈরী আবহাওয়ায় জনজীবন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। সবশেষ ‘মার্টা’ নামের ঝড়ের আঘাতে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেছে। এতে দুই দেশে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে এবং ১১ হাজারের বেশি মানুষ ঘরছাড়া হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
শনিবার স্পেনের উত্তরাঞ্চলে ভারী তুষারপাতের সময় একটি সড়ক পরিষ্কারক স্নোপ্লো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনায় পড়লে চালক নিহত হন। অন্যদিকে, পর্তুগালের ক্যাম্পো মাইওর এলাকায় নদীর প্রবল স্রোতে ডুবে মারা যান ৪৬ বছর বয়সি এক ব্যক্তি। গত এক সপ্তাহে ‘লিওনার্দো’ ও ‘মার্টা’ নামের ধারাবাহিক ঝড়ের কারণে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচজনে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় আন্দালুসিয়া অঞ্চল। সেখানে নদীর পানি বৃদ্ধি, ভূমিধস ও প্লাবনের কারণে ১১ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
প্রবল বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি এলাকায় তুষারপাতের ফলে, স্পেনে অন্তত ১৭০টি সড়ক বন্ধ হয়ে গেছে, পর্তুগালে রেল যোগাযোগ সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্কে বিঘ্ন ঘটেছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ক্রীড়াঙ্গনেও। নিরাপত্তাজনিত কারণে লা লিগার গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ, সেভিলা বনাম গিরোনা স্থগিত করা হয়েছে।
ঝড় ও অতিবৃষ্টির সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে কৃষি খাতে। পর্তুগালের কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির কৃষি ও বন খাতে প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন ইউরো (প্রায় ৮৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)। স্পেনের কৃষকরাও মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বিশেষ করে আন্দালুসিয়ায়, হাজার হাজার হেক্টর জমির ব্রকলি, গাজর ও ফুলকপি ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে এবং ফসল পচে যাওয়ার আশঙ্কায় কৃষকেরা চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। কৃষক সংগঠনগুলো পরিস্থিতিকে ‘প্রাকৃতিক মহাবিপর্যয়’ আখ্যা দিয়ে সরকারের কাছে জরুরি আর্থিক সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে।
অতিরিক্ত জলাবদ্ধতার কারণে স্পেনের আন্দালুসিয়ার কয়েকটি পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। এমনকি কিছু এলাকায় মাটি কাঁপার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এ পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য ভূকম্পন বা ভূমিধসের আশঙ্কা খতিয়ে দেখতে বিশেষজ্ঞ ভূতাত্ত্বিক দল মোতায়েন করেছে স্পেন সরকার।
এদিকে, গুয়াদালকুইভির নদীর পানি বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছানোয় নদীতীরবর্তী বহু এলাকা খালি করে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় পর্তুগালে ২৬ হাজার ৫০০ উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। সেনাবাহিনী, দমকল বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবীরা একযোগে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালাচ্ছেন। স্পেনেও জরুরি অবস্থা জারি করে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে সেনা ও সিভিল প্রোটেকশন ইউনিট নামানো হয়েছে।
আবহাওয়াবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এ ধরনের চরম আবহাওয়া ঘটনা ক্রমেই ঘন ঘন ও তীব্র হয়ে উঠছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেরই ইঙ্গিত। তাদের মতে, স্পেন ও পর্তুগালের এই সাম্প্রতিক বিপর্যয় ভবিষ্যতে ইউরোপের দক্ষিণাঞ্চলের জন্য আরও বড় দুর্যোগের পূর্বাভাস দিতে পারে।


