পৃথিবীর কিছু শহর থাকে যা মানুষের কল্পনার জগৎ থেকে বাস্তবের পথে পা রাখে। একজন ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রের কাছে আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিন ঠিক তেমনই এক শহর, স্বপ্ন, সাহিত্য আর সংস্কৃতির মিলনভূমি। সম্প্রতি সেই কল্পনার শহরে এক বাস্তবের ভ্রমণ সম্পন্ন হয়েছে আমার, যা আমার শিক্ষাজীবন, সাহিত্যপ্রীতি এবং সমাজকর্মের সঙ্গে এক গভীর সংযোগ স্থাপন করেছে। আর এই যাত্রা কেবল একটি ভ্রমণই ছিল না, বরং ছিল সাহিত্যের পৃষ্ঠায় হেঁটে চলার এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

২০২৩ সালের শেষ প্রান্তে আমার ডাবলিন সফরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল বিশ্বখ্যাত ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিন-এ কিছুদিন থাকার সুযোগ। ঐতিহাসিক ট্রিনিটি কলেজ এমন অনেক কিংবদন্তী সাহিত্যিকের জন্মভূমি, যাদের লেখা আমার সাহিত্যপ্রীতির ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। যেমন: জোনাথন সুইফট, অস্কার ওয়াইল্ড, এবং স্যামুয়েল বেকেট।
গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ আবাসিক হলে ছাত্রছাত্রীরা থাকে না, তখন কর্তৃপক্ষ হলগুলোকে বাণিজ্যিক আবাসন হিসেবে ব্যবহার করে। এই সুযোগেই আমার সেখানে থাকার অভিজ্ঞতা হয়। আবাসনটি ছিল কমপক্ষে ৩/৪ তারকা মানের, যেখানে ঐতিহাসিক স্থাপত্যশিল্পের বিশাল কক্ষগুলোতে আধুনিক সকল সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান।

ট্রিনিটি কলেজের লাইব্রেরির সুবিখ্যাত “দ্য লং রুম “-এ প্রবেশ করা ছিল আমার কাছে ‘সময়ের একটি মহাকাব্যিক করিডোরে’ প্রবেশের মতো। পুরনো বইয়ের ঘ্রাণ, ধুলো মেশানো নীরবতা এবং ছাদের নিচে সংরক্ষিত জ্ঞান ও ইতিহাস আমাকে দারুণভাবে মুগ্ধ করে।
এক সন্ধ্যায় কলেজ চত্বরে হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ে যায় ট্রিনিটির প্রাক্তনী অস্কার ওয়াইল্ডের বিখ্যাত উক্তি: “আমার প্রতিভা ছাড়া আর কিছুই ঘোষণা করার নেই”। আমার অভিজ্ঞতায় বলা যায়, এই শহর যেন সত্যিই প্রতিটি প্রতিভাকে তার নিজস্ব ছায়া দিতে জানে।

ডাবলিন সফরকালে আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হই। সেটা হলো ২০১৯ সাল থেকে স্পিক ঢাকা (SPEAK Dhaka)-এর অ্যাম্বাসেডর হিসেবে যুক্ত হওয়া। ডাবলিনে স্পিক ডাবলিন (SPEAK Dublin)-এর অ্যাম্বাসেডর মহিনি সোমানের সাথেও আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং করি।
(“স্পিক(SPEAK) হলো বিশ্বজুড়ে ভাষা ও সংস্কৃতির বিনামূল্যে বিনিময়ের একটি দুর্দান্ত প্ল্যাটফর্ম, যা মোবাইল অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ৬০টিরও বেশি ভাষা শেখা ও শেখানোর সুযোগ দেয়।”)
আমার এই ভ্রমণে সঙ্গী ছিলেন একজন শ্রদ্ধেয় বাঙালি বড় ভাই, যিনি ইতালীয় নাগরিক এবং দীর্ঘকাল ধরে আয়ারল্যান্ডে বসবাস করছেন। তাঁর দিকনির্দেশনাই আমাকে ডাবলিনে ঘুরে বেড়ানো সহজ করে দিয়েছে। ডাবলিনে আমরা একসঙ্গে শহরের একাধিক ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শন করেছি। এরমধ্যে রয়েছে, প্রেম ও সংযোগের প্রতীক “হা’পেনি ব্রিজ”, উপনিবেশ ও মুক্তির ইতিহাসের সাক্ষী “ডাবলিন ক্যাসেল”, শহরের প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র “টেম্পল বার ডিস্ট্রিক্ট”। এ ছাড়া দেখার সুযোগ হয়েছে, “রিভার লিফি” যেখানে শহরের আত্মা ও সময় প্রবাহিত হয়।

এই স্থানগুলোতে ঘুরতে ঘুরতে আমার বারবার মনে হয়েছে, সাহিত্য ও ইতিহাস যেন এখানে জীবন্ত। প্রতিটি দেয়ালে, সেতুতে ও পথে ছড়িয়ে আছে শতাব্দীর গল্প।
ডাবলিনে কাটানো দিনগুলোয় আমি যেন নিজের সাহিত্যিক অস্তিত্বের সঙ্গে সংলাপে লিপ্ত হয়েছি। সফরের শেষে তাই আমার মনে পড়ে যায় জেমস্ জয়েসের সেই বিখ্যাত লাইন: “যখন আমি মারা যাব, ডাবলিন আমার হৃদয়ে লেখা থাকবে।” আমার এই ডাবলিন ভ্রমণ কেবল একটি শহর দেখা নয়, বরং তাঁর শিকড়, পঠিত সাহিত্য, সমাজকর্ম এবং আত্মার গভীরে পৌঁছানোর একটি সুযোগ ছিল। এই শহর আমাকে শিখিয়েছে, সাহিত্য কেবল পাঠের জন্য নয়, বরং বেঁচে থাকার প্রেরণা, আর ভাষা কেবল কথা বলার মাধ্যম নয়, বরং হৃদয়ের বন্ধন গড়ার এক সেতু।


