বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ শেষে এখন সারাদেশে চলছে ভোট গণনা। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের জন্য ৪০ হাজারের বেশি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রায় ১২ কোটির বেশি ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পান।
এখন পর্যন্ত বেসরকারি গণনা অনুযায়ী সর্বশেষ যে আসনগুলোর ফল এসেছে, তা বিভিন্ন লাইভ আপডেট ও সংবাদ সূত্র থেকে সর্বশেষ পাওয়া তথ্য হলো, বিএনপি ও মিত্রজোট ২৭ আসনের বেশি আসনে এগিয়ে রয়েছে। জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ১৪ আসন, জাতীয় পার্টি ১ আসন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১ আসন এবং ছাত্র-সমর্থিত নাগরিক দল (এনসিপি) পেয়েছে ১ আসন। এছাড়া আলাদা কিছু আসনে ব্যক্তিগত বিজয়ের তথ্য হলো, তারেক রহমান ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসনে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন, মির্জা ফখরুল ঠাকুরগাঁও-১ আসনে জয় লাভ করেছেন। এছাড়া ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বিজয়ী হয়েছেন।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মোট সরাসরি নির্বাচিত আসন ৩০০টি (ভোট হয়েছে ২৯৯টিতে), সরকার গঠনে প্রয়োজন ১৫১ আসন, যদিও এখনও পূর্ণাঙ্গ ফল ঘোষণা হয়নি, গণনা চলছে। এখন পর্যন্ত মাত্র কয়েক ডজন আসনের বেসরকারি ফল এসেছে, আর তাতে বিএনপি জোট এগিয়ে আছে, কিন্তু সরকার গঠনের মতো চূড়ান্ত সংখ্যায় পৌঁছায়নি, এখনও অনেক আসনের ফলাফল বাকি।
এটি শুধু একটি সাধারণ নির্বাচন নয়, দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, গণআন্দোলন ও সরকার পরিবর্তনের পর দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন হওয়ায় রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য এই ভোটকে টার্নিং পয়েন্ট নির্বাচন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ভোর থেকেই রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহর ও জেলা-উপজেলায় ভোটারদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। বিশেষ করে তরুণ ও প্রথমবারের ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেক স্থানে নারী ভোটারদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য ছিল।
নির্বাচন ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আনসার মিলিয়ে ব্যাপক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে অতিরিক্ত ফোর্স, ড্রোন ও সিসিটিভি নজরদারি এবং মোবাইল কোর্ট ও স্ট্রাইকিং ফোর্স প্রস্তুত রাখা হয়। বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ, কেন্দ্র দখলের চেষ্টা ও অনিয়মের অভিযোগ এলেও অধিকাংশ কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে বলে নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে।
এবারের নির্বাচনে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে ৫০টির বেশি রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী অংশ নেয়। তবে বাস্তবে লড়াই সীমাবদ্ধ ছিল কয়েকটি প্রধান জোটের মধ্যে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট, ইসলামপন্থী ও ডানপন্থী জোটসমূহ এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী।
দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা বাংলাদেশের বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় ভোটের চরিত্র আগের যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় ভিন্ন হয়েছে। ফলে বহু আসনে ত্রিমুখী বা বহুমুখী লড়াই দেখা গেছে।
ভোট গণনা শুরু হওয়ার পর রাত থেকেই বিভিন্ন আসনে অনানুষ্ঠানিক ফলাফল আসতে শুরু করেছে। প্রাথমিক প্রবণতায় কয়েকটি বড় রাজনৈতিক জোট উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে এগিয়ে থাকার খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে নির্বাচন কমিশন বলছে, সব কেন্দ্রের ফল হাতে না পাওয়া পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য করা যাবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচনের ফলাফলে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নাও আসতে পারে, সেক্ষেত্রে জোট সরকার বা সমঝোতার রাজনীতি সামনে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক আগ্রহ ছিল ব্যাপক। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পর্যবেক্ষক দল মাঠে কাজ করেছে। বিদেশি কূটনীতিকরা অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার ওপর নির্ভর করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নির্বাচন কমিশন প্রথমবারের মতো উন্নত ডিজিটাল ফলাফল ব্যবস্থাপনা চালু করেছে। অনলাইনে কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল, মোবাইল অ্যাপে লাইভ আপডেট, দ্রুত রিটার্নিং অফিসার রিপোর্টিং-এর ফলে অতীতের তুলনায় দ্রুত ফলাফল জানার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন, নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভবিষ্যৎ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি ও গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতার পরীক্ষা।
চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার পরই পরিষ্কার হবে, কে সরকার গঠন করবে, জোট সরকার নাকি একক সরকার ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কতটা আসবে। ফলাফল ঘোষণার পর বিজয়ী দলকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাবে রাষ্ট্রপতি এবং শুরু হবে নতুন সংসদের যাত্রা।


