বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার বিপ্লব পরবর্তী প্রথম সাধারণ নির্বাচনে দেশের মানুষ তাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে। দীর্ঘ ২০ বছর (প্রায় দুই যুগ) ক্ষমতার বাইরে থাকার পর নিরঙ্কুশ জয় নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। সর্বশেষ বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, ৩০০ আসনের সংসদের ২৯৯টি আসনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি ও তার মিত্ররা ২০৭টি আসন নিশ্চিত করে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।এই বিশাল বিজয়ের মাধ্যমে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন। ৩৫ বছর পর দেশ একজন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে।
নির্বাচনী ফলাফলের চিত্র
শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত প্রাপ্ত ২৮৮টি আসনের বেসরকারি ফলাফলের সংক্ষিপ্ত চিত্র। বিএনপি ও মিত্র জোট ২০৭টি আসন পেয়েছে (সরকার গঠন)। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ১১-দলীয় জোট পেয়েছে ৭৩টি আসন (প্রধান বিরোধী দল), জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পেয়েছে ৬টি আসন (নতুন রাজনৈতিক শক্তি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ পেয়েছে ১টি আসন এবং স্বতন্ত্র ও অন্যান্যরা ৮টি আসন পেয়েছে। উল্লেখ্য, শেরপুর-৩ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মো. নুরুজ্জামান বাদলের মৃত্যুতে নির্বাচন কমিশন সেখানে ভোট স্থগিত করেছে। ওই আসনে পুনরায় তফসিল ঘোষণা করা হবে।
আলোচিত জয়-পরাজয়
এবারের নির্বাচনে হেভিওয়েট প্রার্থীদের লড়াই ছিল দেখার মতো। বিশেষ করে ঢাকা ও বগুড়ার আসনগুলো ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। বিএনপির কাণ্ডারি তারেক রহমান ঢাকা-১৭ (গুলশান-বনানী) এবং বগুড়া-৬, উভয় আসনেই বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। ঢাকা-১৭ আসনে তিনি ৭২ হাজার ৬৯৯ ভোট পেয়ে জামায়াতের প্রার্থী স ম খালিদুজ্জামানকে (৬৮ হাজার ৩০০ ভোট) ৪ হাজার ৩৯৯ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। বগুড়া-৬ আসনে তিনি ১ লাখ ১৮ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন। এছাড়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী (চট্টগ্রাম-১১) এবং সালাহউদ্দিন আহমেদ নিজ নিজ আসনে জয়ী হয়েছেন।
ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থীকে ২১ হাজার ৬১৪ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে চমক সৃষ্টি করেছেন। জামায়াত (সেক্রেটারি) মিয়া গোলাম পরওয়ার খুলনা-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থীর কাছে পরাজিত হয়েছেন।
ঢাকা-১২ আসনে বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়া আলোচিত নেতা সাইফুল আলম নীরব পরাজিত হয়েছেন। এই আসনে জয়ী হয়েছেন জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মো. সাইফুল আলম।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শক্ত অবস্থান দেখিয়েছে। ঢাকা-১১ আসনে এনসিপির অন্যতম নেতা নাহিদ ইসলাম বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। এনসিপি (শাপলা কলি) হাসনাত আবদুল্লাহকুমিল্লা-৪ আসন থেকে ১ লাখ ৭২ হাজার ভোট পেয়ে রেকর্ড জয় পেয়েছেন। সারজিস আলম (শাপলা কলি) পঞ্চগড়-১ আসনে বিএনপির নওশাদ জমিরের কাছে মাত্র ৮ হাজার ১২০ ভোটে পরাজিত হয়েছেন। এছাড়া, ঢাক-৮ আসনে বিএনপির মির্জা আব্বাসের কাছে হেরেছেন এনসিপির অন্যতম ও সবচেয়ে বেশি আলোচিত নেতা নাসির উদ্দীন পাটোয়ারী। ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে পরাজিত হয়েছেন এনসিপির সাবেক নেত্রী তাসমিন জারা।
এছাড়া, আলোচিত রুমিন ফারহানা ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে থেকে স্বতন্ত্র হয়েও ৩৭ হাজার ৫৬৮ ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন। গণঅধিকার পরিষদ নুরুল হক নুর পটুয়াখালী-৩ আসন থেকে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হাসান মামুনকে পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশের পরপরই প্রতিবেশী দেশসহ বিশ্বনেতারা তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানাতে শুরু করেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক বার্তায় তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ তারেক রহমানকে “অভূতপূর্ব বিজয়”-র জন্য শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তিনি সফলভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করায় বাংলাদেশের জনগণকে সাধুবাদ জানান এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের আশা প্রকাশ করেন।
এছাড়া, তুরস্ক, কাতার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা এই নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক উত্তরণের নতুন মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছেন।
দুই দলের প্রতিক্রিয়া
বিশাল জয়ের পরও আনন্দ মিছিলে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন তারেক রহমান। দলের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, জনগণ আমাদের ওপর যে দায়িত্ব দিয়েছে, তা পালনে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। ১৭ বছরের জুলুমের পর দেশ এখন পুনর্গঠনের পথে। আজ সারা দেশে শুকরিয়া দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিবেশকে ইতিবাচক ও শান্তিপূর্ণ আখ্যা দিলেও নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার প্রক্রিয়া নিয়ে নিজেদের অসন্তোষের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের নির্বাচনে প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটারের মধ্যে বড় অংশই ছিল তরুণ (জেন-জি)। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে মাঠের লড়াই মূলত বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হলেও, মানুষ শেষ পর্যন্ত বিএনপির অভিজ্ঞ নেতৃত্বের ওপরই ভরসা রেখেছে। অন্যদিকে, এনসিপি এবং জামায়াতের ভালো ফল ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বহুদলীয় ভারসাম্যপূর্ণ সংসদ উপহার দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের পর আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বঙ্গভবনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।


