নেদারল্যান্ডস বা ওলন্দাজদের দেশ মানেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে দিগন্তজোড়া টিউলিপ বাগান আর উইন্ডমিলের দৃশ্য। কিন্তু এই দেশের আসল পরিচয় লুকিয়ে আছে এর রাজপথে, যেখানে ইঞ্জিনের গর্জন নয়, শোনা যায় সাইকেলের চেইনের মৃদু ছন্দ।
১৭ মিলিয়ন মানুষের এই দেশে সাইকেলের সংখ্যা ২৩ মিলিয়নেরও বেশি। অর্থাৎ, মাথাপিছু সাইকেলের গড় ১.৩টি। কেন একটি উন্নত দেশ হওয়া সত্ত্বেও তারা দামি গাড়ি ছেড়ে দুই চাকায় আস্থা রাখল? সেই গল্প এবং নেদারল্যান্ডসের সাইকেল-বিপ্লবের বিস্তারিত তথ্য জানাবো আজকের এই প্রতিবেদনে।
নেদারল্যান্ডস বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে মানুষের চেয়ে দ্বিচক্রযানের সংখ্যা বেশি। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে মোট জনসংখ্যা, ১৭ দশমিক ৮ মিলিয়ন বা ১ কোটি ৭৮ লক্ষ। আর সাইকেলের সংখ্যা ২৩ মিলিয়ন বা ২ কোটি ৩০ লক্ষ। দেশজুড়ে রয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ ডেডিকেটেড সাইকেল পথ। ওলন্দাজরা মোট যাতায়াতের ২৭ শতাংশই সম্পন্ন করেন সাইকেলে। তবে স্বল্প দূরত্বের (৭ দশমিক ৫ কিলোমিটারের কম) ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৫০ শতাংশ।
সাইকেল প্রীতির কারণ
বর্তমান সময়ের এই দৃশ্য সবসময় এমন ছিল না। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে নেদারল্যান্ডসেও গাড়ির আধিপত্য বাড়তে শুরু করেছিল। কিন্তু দুটি প্রধান ঘটনা এই জাতির চিন্তাধারা বদলে দেয়। প্রথমটি হলো ১৯৭০-এর দশকের ‘স্টপ দ্য চাইল্ড মার্ডার’ আন্দোলন। সে সময় সড়ক দুর্ঘটনায় অনেক শিশুর মৃত্যু হচ্ছিল। এর প্রতিবাদে সাধারণ মানুষ ‘শিশুহত্যা বন্ধ করো’ ব্যানারে রাজপথে নেমে আসে এবং নিরাপদ ও সাইকেলবান্ধব রাস্তার দাবি জানায়। দ্বিতীয়টি ছিলো ১৯৭৩ সালের তেল সংকট। মধ্যপ্রাচ্যের তেল অবরোধের কারণে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হলে ডাচ সরকার জনগণকে জ্বালানি সাশ্রয়ী যাতায়াতে উৎসাহিত করে। তখন থেকেই অবকাঠামো বদলে ফেলার কাজ শুরু হয়।
পরিবেশ ও অর্থনীতিতে নীরব বিপ্লব
নেদারল্যান্ডসের এই সাইকেল সংস্কৃতি শুধু শখ নয়, বরং পরিবেশ ও অর্থনীতির এক বিশাল রক্ষাকবচ। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ৭ কিলোমিটার গাড়ি চালানোর বদলে সাইকেল চালালে ১ কেজি কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমানো সম্ভব। বছরে প্রায় ২ মিলিয়ন টন কার্বন নিঃসরণ সাশ্রয় করছে দেশটি। নিয়মিত সাইকেল চালানোর ফলে ওলন্দাজদের গড় আয়ু অন্যান্য ইউরোপীয়দের তুলনায় প্রায় ৬ মাস বেশি। এতে তাদের স্বাস্থ্য খাতে বার্ষিক প্রায় ১৯ বিলিয়ন ইউরো সাশ্রয় হয়। গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি খরচের তুলনায় সাইকেল চালানো কয়েক গুণ সস্তা। একজন নাগরিক বছরে গড়ে ৩০০ ইউরো সাইকেলের জন্য ব্যয় করেন, যেখানে গাড়ির পেছনে ব্যয় হয় ৮,৫০০ ইউরো পর্যন্ত।
প্রধানমন্ত্রীর বাহন সাইকেল
নেদারল্যান্ডসে সাইকেল চালানো কোনো সামাজিক মর্যাদার বিষয় নয়। সাধারণ পরিচ্ছন্নতা কর্মী থেকে শুরু করে খোদ প্রধানমন্ত্রীকেও মাঝেমধ্যে সাইকেলে চড়ে অফিসে যেতে দেখা যায়। বর্তমানে দেশটির মোট সাইকেল বিক্রির অর্ধেকই ‘ই-বাইক’ বা ইলেকট্রিক সাইকেল। এর ফলে বয়স্ক মানুষ এবং দীর্ঘ দূরত্বের যাত্রীদের কাছেও সাইকেল এখন জনপ্রিয়। এছাড়া ‘ইউট্রেখ্ট’ শহরে বিশ্বের বৃহত্তম সাইকেল পার্কিং গ্যারেজ রয়েছে, যেখানে ১২ হাজার ৫০০টি সাইকেল একসাথে রাখা যায়।
নেদারল্যান্ডস প্রমাণ করেছে যে, আধুনিকতা মানেই বড় বড় ফ্লাইওভার আর বিলাসবহুল গাড়ি নয়। বরং একটি টেকসই ভবিষ্যৎ গড়তে হলে মাটির কাছাকাছি থাকা সাধারণ যানটিও হতে পারে শ্রেষ্ঠ সমাধান। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে নেদারল্যান্ডস কেবল একটি দেশ নয়, বরং একটি আদর্শিক মডেল।


