বিশ্বজুড়ে বিদেশে পড়াশোনা করা ভারতীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা এখন ১৮ লাখেরও বেশি। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া এতদিন ছিল তাদের প্রধান গন্তব্য। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, এই বিপুল সংখ্যার তুলনায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) ভারতীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল এক লাখেরও কম। এই বৈষম্য ঘোচাতে এবং একই সঙ্গে নিজেদের বাড়তে থাকা শ্রমঘাটতি মোকাবিলায় এবার ভারতের সঙ্গে ভিসা ও মানুষ-চলাচল সহজ করার চুক্তি করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চুক্তি শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, ইউরোপের ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের জন্যও একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত।
ভারতীয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইউরোপের প্রতি আগ্রহ কম থাকার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ ছিল, দেশভেদে ভিন্ন ভিন্ন ভিসা নিয়ম, জটিল ও দীর্ঘ আবেদন প্রক্রিয়া, পড়াশোনার পর কাজের সুযোগ স্পষ্ট না থাকা এবং তথ্যের অভাব ও সমন্বিত গাইডলাইন না থাকা। ফলে ইংরেজিভাষী দেশগুলো সহজ বিকল্প হিসেবে এগিয়ে ছিল।
ইইউ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত মানুষের বৈধ চলাচল ও অভিবাসন সহযোগিতা চুক্তির মূল লক্ষ্য, বৈধ ও দক্ষ মানুষ চলাচল সহজ করা, শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া দ্রুত করা ও ইউরোপের শ্রমঘাটতি পূরণে বিদেশি ট্যালেন্ট আনা।
ভারতীয় শিক্ষার্থী, গবেষক ও দক্ষ কর্মীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও মাল্টি-এন্ট্রি ভিসার সুযোগ বাড়ানো হচ্ছে। এতে বারবার আবেদন করার ঝামেলা কমবে। ইইউভুক্ত অনেক দেশে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর ২-৩ বছর পর্যন্ত থাকার ও কাজ করার সুযোগ মিলবে। এটি ভারতীয় শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
ভারতে ইইউ প্রথমবারের মতো একটি আইনসম্মত অভিবাসন গেটওয়ে কার্যালয় চালু করছে। এখান থেকে পাওয়া যাবে, কোন দেশে কোন বিষয়ে চাহিদা বেশি, কোন ডিগ্রি বা স্কিল ইউরোপে স্বীকৃত এবং কীভাবে বৈধভাবে কাজ ও পড়াশোনার পথ তৈরি করা যায়। তবে এই অফিস ভিসা দেয় না, এটি শুধুমাত্র তথ্য ও দিকনির্দেশনার কেন্দ্র।
ইউরোপের বহু দেশে জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হয়ে যাচ্ছে। জন্মহার কম, কিন্তু শিল্প ও সেবাখাতে কাজের চাহিদা বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি শ্রমঘাটতির খাতগুলো হলো, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল ও ম্যানুফ্যাকচারিং, স্বাস্থ্যসেবা (নার্স, কেয়ারগিভার, চিকিৎসক), নির্মাণ ও পরিবহন এবং কৃষি ও ফুড প্রসেসিং। ইইউর ধারণা, ভারতীয় শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পর এই খাতগুলোতেই যুক্ত হবে, ফলে একসঙ্গে শিক্ষা ও শ্রম সংকট, দুই সমস্যার সমাধান হবে।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্যে সাম্প্রতিক, ভিসা প্রত্যাখ্যান বেড়েছে, কাজের অনুমতি সীমিত হয়েছে, স্থায়ী বসবাসের পথ কঠিন হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইউরোপ নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে চাইছে, পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ ও বসবাস একটি স্পষ্ট ও তুলনামূলক স্থিতিশীল পথ হিসেবে।
এ চুক্তির ফলে ভারত ও ইউরোপ, দুই পক্ষের লাভ। এরমধ্যে ভারতের জন্য সুবিধাগুলো হলো, শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন ও নিরাপদ গন্তব্য, আন্তর্জাতিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন ও ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স ও জ্ঞান স্থানান্তর।আর ইউরোপের জন্য সুবিধা হলো, দক্ষ তরুণ কর্মী পাওয়া, অর্থনীতির গতি বজায় রাখা ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কর্মজীবী জনসংখ্যা বাড়ানো।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ভিসা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো সদস্যদেশগুলোর হাতে, এতে ভাষা ও সংস্কৃতিগত চ্যালেঞ্জ থাকবে, যদিও সব দেশে সুযোগ সমান নয়।তবু এটুকু স্পষ্ট, এই চুক্তি ইউরোপে যাওয়ার দরজা আগের চেয়ে অনেক বেশি খোলা ও সংগঠিত করেছে।
যেখানে একদিকে বিশ্বজুড়ে ১৮ লাখের বেশি ভারতীয় শিক্ষার্থী বিদেশে পড়ছেন, অন্যদিকে ইউরোপ দীর্ঘদিন সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারেনি। নতুন এই চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপ এখন স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে, আমরা তোমাদের চাই, শিক্ষার্থী হিসেবেও, কর্মী হিসেবেও।আগামী কয়েক বছরে এর প্রভাব শুধু শিক্ষার পরিসংখ্যানে নয়, ইউরোপের শ্রমবাজার ও অভিবাসন নীতিতেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে।


