ইউরোপে বৈধভাবে কাজ ও বসবাস করতে ইচ্ছুক তৃতীয় দেশের নাগরিকদের জন্য বড় স্বস্তির বার্তা এসেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে সংশোধিত একক অনুমতি নীতিমালা অনুমোদন করেছে, যার ফলে এখন থেকে কাজের অনুমতি (ওয়ার্ক পারমিট) ও থাকার অনুমতি (রেসিডেন্স পারমিট) একটিমাত্র আবেদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাওয়া যাবে। দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা, দ্বৈত আবেদন, দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি অনিশ্চয়তার অবসান ঘটাতে এই আইনকে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই নতুন বিধানটি অনুমোদন দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাউন্সিল, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী অন্যতম প্রধান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা। এর মাধ্যমে ২০১১ সালের পুরোনো নির্দেশনাটি হালনাগাদ করে আরও কার্যকর, দ্রুত ও কর্মীবান্ধব কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউরোপে দক্ষ ও অদক্ষ, উভয় ধরনের শ্রমবাজারের ঘাটতি পূরণ, অভিবাসন ব্যবস্থাকে আধুনিক করা এবং বৈধ অভিবাসনের পথ সহজ করাই এই আইনের মূল লক্ষ্য।
নতুন আইনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, এখন থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো সদস্য দেশে কাজ করতে চাইলে একজন নন-ইইউ নাগরিককে আলাদা করে ওয়ার্ক পারমিট ও রেসিডেন্স পারমিটের জন্য আবেদন করতে হবে না। একক আবেদনেই দুই অনুমতির সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে। আগে অনেক দেশে আলাদা দপ্তর, আলাদা ফি এবং আলাদা সময়সীমার কারণে আবেদন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হতো। ফলে চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান ও কর্মী—উভয় পক্ষই অনিশ্চয়তায় পড়তেন। নতুন কাঠামো সেই জটিলতা কমিয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংশোধিত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সাধারণত আবেদন পাওয়ার পর সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে কর্তৃপক্ষকে সিদ্ধান্ত জানাতে হবে। বিশেষ জটিল ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম থাকতে পারে, তবে নিয়মিত প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ অপেক্ষার সুযোগ কমে আসবে। এর ফলে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে এবং বিদেশি কর্মীরাও পরিকল্পনা করতে পারবেন নিশ্চিতভাবে।
আইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সিঙ্গেল পারমিটধারীরা নির্দিষ্ট শর্তে নিয়োগকর্তা পরিবর্তনের সুযোগ পাবেন। আগে অনেক দেশে পারমিট নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাঁধা থাকত, ফলে কর্মক্ষেত্রে সমস্যা হলেও সহজে চাকরি বদলানো যেত না। নতুন নিয়ম কর্মীদের অধিক স্বাধীনতা দেবে এবং শোষণ বা অনৈতিক আচরণের ঝুঁকি কমাবে। একই সঙ্গে সীমিত সময়ের জন্য বেকার থাকলেও পারমিট বাতিল হবে না, এমন সুরক্ষাও রাখা হয়েছে।
সংশোধিত একক অনুমতি নীতিমালায় সমান কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টিও জোর দেওয়া হয়েছে। তৃতীয় দেশের নাগরিকরা কর্মঘণ্টা, ছুটি, বেতন, কর্মস্থলের নিরাপত্তা এবং সামাজিক সুরক্ষা সুবিধার ক্ষেত্রে স্থানীয় নাগরিকদের মতো সমান অধিকার পাবেন। এতে বৈধভাবে কাজ করা অভিবাসীদের অধিকার সুরক্ষিত হবে এবং বৈষম্য কমবে।
আইনটি ইউরোপীয় পর্যায়ে অনুমোদিত হলেও এটি সরাসরি সব দেশে একই দিনে কার্যকর হবে না। সদস্য দেশগুলোকে তাদের জাতীয় আইনে এই নির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত করতে নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া হয়েছে (সাধারণত দুই বছর)। অর্থাৎ, প্রতিটি দেশ নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো অনুযায়ী বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নেবে। ফলে বিভিন্ন দেশে কার্যকর হওয়ার সময় কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিকাংশ সদস্য রাষ্ট্রে এই নির্দেশনা প্রযোজ্য হবে। তবে কিছু দেশ, যেমন ডেনমার্ক ও আয়ারল্যান্ড, ইইউ’র অভিবাসন নীতির নির্দিষ্ট অংশে আলাদা অবস্থান রাখে, তাই তাদের ক্ষেত্রে আলাদা বিধান থাকতে পারে। আবেদনকারীদের সংশ্লিষ্ট দেশের অভিবাসন দপ্তরের নির্দেশনা যাচাই করে আবেদন করতে হবে।
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মী ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাজের উদ্দেশ্যে যান, বিশেষ করে ইতালি, গ্রিস, স্পেন, পর্তুগাল ও পূর্ব ইউরোপের কয়েকটি দেশে। নতুন এই আইন তাদের জন্য আবেদন প্রক্রিয়া সহজ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একক আবেদন ব্যবস্থার কারণে দালালনির্ভরতা কমতে পারে এবং সরকারি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে।
এছাড়া ইউরোপে বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, নির্মাণ, প্রযুক্তি ও সেবাখাতে শ্রমিকের ঘাটতি রয়েছে। বৈধ ও দ্রুত আবেদন প্রক্রিয়া চালু হলে দক্ষ কর্মীদের জন্য সুযোগ বাড়বে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, আইন সহজ হলেও যোগ্যতা, ভাষাজ্ঞান, চাকরির অফার এবং কাগজপত্রের শুদ্ধতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈধ অভিবাসনের পথ সহজ হলে অনিয়মিত বা ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপে প্রবেশের প্রবণতা কমতে পারে। প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে স্বচ্ছ ও সময়সীমাবদ্ধ প্রক্রিয়া তৈরি করলে মানুষ বৈধ উপায়ে আবেদন করতে উৎসাহিত হবে। এতে মানবপাচার ও দালালচক্রের কার্যক্রমও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে।
ইউরোপের জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হয়ে যাচ্ছে এবং অনেক দেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যা কমছে। ফলে উৎপাদনশীলতা ধরে রাখতে বিদেশি কর্মীর প্রয়োজন বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে একক অনুমতি আইনকে শ্রমবাজারে ভারসাম্য রক্ষার কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে। দক্ষ কর্মীদের দ্রুত অন্তর্ভুক্ত করা গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।
তবে মনে রাখতে হবে, এই আইন ভিসামুক্ত প্রবেশের সুযোগ নয়। আবেদনকারীকে অবশ্যই নির্দিষ্ট দেশের শর্ত পূরণ করতে হবে, চাকরির অফার থাকতে হবে এবং নিরাপত্তা ও আইনি যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। সদস্য রাষ্ট্রগুলো নিজ নিজ কোটার সীমা, খাতভিত্তিক চাহিদা এবং অভ্যন্তরীণ নীতির ভিত্তিতে আবেদন অনুমোদন করবে।
ইউরোপীয় কমিশন ইতোমধ্যে বৈধ অভিবাসন কাঠামো আধুনিক করার অংশ হিসেবে ব্লু কার্ড ও অন্যান্য স্কিমও সংস্কার করেছে। একক অনুমতি আইন সেই ধারাবাহিকতার অংশ। এর মাধ্যমে ইউরোপ একদিকে যেমন শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণ করতে চাইছে, অন্যদিকে অভিবাসীদের অধিকার ও সুরক্ষা জোরদার করছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ইউরোপে কাজের স্বপ্ন দেখা লাখো প্রবাসীর জন্য এটি এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিল। এক আবেদনেই কাজ ও থাকার অনুমতি, এই সহজীকরণ প্রক্রিয়া সময় বাঁচাবে, জটিলতা কমাবে এবং আইনি স্বচ্ছতা বাড়াবে। এখন নজর থাকবে সদস্য দেশগুলো কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে এবং প্রবাসীরা বাস্তবে কতটা সুফল পান।


