আশ্রয় আবেদন বাতিল হয়ে যাওয়া অভিবাসীদের দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন-এর বাইরের কোনো দেশে “রিটার্ন হাব” বা প্রত্যাবাসন কেন্দ্র নির্মাণে চার দেশের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে গ্রিস। গ্রিসের সঙ্গে এই উদ্যোগে রয়েছে, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রিয়া ও ডেনমার্ক।পাঁচ দেশের লক্ষ্য, আফ্রিকার কোনো একটি দেশে এমন কেন্দ্র স্থাপন করা যেখানে প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থী বা যাদের ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার বৈধতা নেই তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর আগে অস্থায়ীভাবে রাখা হবে। ইউরোপীয় অভিবাসন নীতিতে এটি একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
“রিটার্ন হাব” কি
রিটার্ন হাব বা প্রত্যাবাসন কেন্দ্র এই ব্যবস্থায় ইউরোপে ঢোকার পরও কেউ সরাসরি ইউরোপে থাকতে পারবে না। বরং সীমান্তে নিবন্ধন, দ্রুত আশ্রয় যাচাই, আবেদন বাতিল, ইউরোপের বাইরের কেন্দ্রে পাঠানো ও সেখান থেকে নিজ দেশে ফেরত, অর্থাৎ ইউরোপে ঢোকা মানেই ইউরোপে থাকা নয়।
গ্রিক মন্ত্রীর ঘোষণা
গ্রিসের অভিবাসনমন্ত্রী থানোস প্লেভরিস বলেন, সব ঠিক থাকলে কেন্দ্রটি আফ্রিকাতেই হবে। তিনি জানান, পাঁচ দেশের মন্ত্রীরা ইতোমধ্যে আলোচনা করেছেন এবং শিগগিরই কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক হবে। এখন বিষয়টি নীতিগত আলোচনা থেকে বাস্তব পরিকল্পনায় যাচ্ছে। যদিও আফ্রিকার কোন দেশে কেন্দ্র হবে তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
যে কারণে এই পরিকল্পনা
ইউরোপের সবচেয়ে বড় সংকট হলো, আবেদন বাতিল হলেও দেশে না ফিরে থাকা অভিবাসী, অর্থাৎ যাদের আশ্রয় আবেদন বাতিল হয়েছে কিন্তু তারা থেকে যায়। উদাহরণ হলো গ্রিসে বছরে আসে ৪০–৫০ হাজার মানুষ, এরমধ্যে অর্ধেকের আবেদন বাতিল হলেও ফেরত পাঠানো যায় মাত্র ৫–৭ হাজার। ফলে হাজার হাজার মানুষ “আইনগত শূন্য অবস্থায়” ইউরোপে থেকে যায়।
কেন্দ্রগুলোতে কারা থাকবে
এই রিটার্ন হাবে রাখা হবে, আশ্রয়প্রার্থী, প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থী, অনিয়মিত অভিবাসী ও বহিষ্কার / দেশে ফেরত পাঠানো অভিবাসীদের। এছাড়া যাদের নিজ দেশ নাগরিক হিসেবে নিতে চায় না, তাদেরও এখানে রাখা হবে।
মানবপাচার রোধই মূল লক্ষ্য
ইউরোপীয় দেশগুলোর মতে বর্তমানে পাচারকারীরা অভিবাসীদের বলে, ইউরোপে ঢুকলেই থেকে যাওয়া যায়, কিন্তু নতুন নীতি বলছে, ঢুকলেও ইউরোপে থাকা যাবে না, বাইরের ক্যাম্পে যেতে হবে। এতে সমুদ্রপথে বিপজ্জনক যাত্রা কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আফ্রিকা কেন
পরিকল্পনা অনুযায়ী কেন্দ্রটি সম্ভবত আফ্রিকার কোনো দেশে হবে। কারণ, ভৌগোলিকভাবে নিকটবর্তী, অভিবাসন রুটের কাছাকাছি এবং দ্রুত ফেরত পাঠানো সহজ। তবে নির্দিষ্ট দেশ এখনও ঘোষণা করা হয়নি।
ইউরোপের প্রধান প্রবেশদ্বার
দশকেরও বেশি সময় ধরে গ্রিস মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও এশিয়া থেকে আসা মানুষের প্রধান প্রবেশপথ। মানুষ সাধারণত আসে, তুরস্ক উপকূল হয়ে এজিয়ান সাগর ও গ্রিক দ্বীপ দিয়ে। এছাড়া উত্তর আফ্রিকা হয়ে ভূমধ্যসাগর এবং ক্রিট ও গাভদোস দিয়েও আসে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই পথগুলো আরও সক্রিয় হয়েছে।
কঠোর হচ্ছে সীমান্তনীতি
গ্রিস কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তবে তাদের বিরুদ্ধে পুশব্যাক করার অভিযোগ রয়েছে। যদিও এই অভিযোগ সরকার অস্বীকার করেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৫ সালে আগমন কমেছে ২১ শতাংশ আর শেষ পাঁচ মাসে কমেছে ৪০ শতাংশ।
নতুন ইউরোপীয় আইন
সম্প্রতি ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নতুন অভিবাসন নীতি অনুমোদন করেছে, নিরাপদ দেশ থেকে এলে আশ্রয় নাও দেওয়া হতে পারে, তৃতীয় দেশে আশ্রয়ের সুযোগ থাকলে ইউরোপ আবেদন না নিয়ে, দ্রুত ফেরত পাঠানো হবে। এটি “এক্সটার্নাল প্রসেসিং” মডেল নামে পরিচিত।
কূটনৈতিক তৎপরতা
অভিবাসী ফেরত পাঠানো বাড়াতে গ্রিস শিগগিরই ইতালি ও স্পেন-এর সঙ্গে বৈঠক করবে। এছাড়া উৎসদেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ে পাকিস্তান-এর সঙ্গেও আলোচনা হবে।
সম্ভাব্য প্রভাব ও বিশেষজ্ঞ মতামত
যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তাহলে অবৈধ পথে ইউরোপে গিয়ে বৈধ হওয়া কঠিন হবে। একইসাথে আশ্রয় আবেদন ও মানবপাচার কমবে। এছাড়া বৈধ শ্রম ভিসা বাড়বে এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী হবে।
শেষ কথা
রিটার্ন হাব প্রকল্প ইউরোপের অভিবাসন ব্যবস্থার দর্শন বদলে দিচ্ছে। আগে মানুষ ঢুকে আবেদন করত, এখন
আবেদন হওয়ার আগেই ইউরোপের বাইরে আটকে দেওয়া হবে। অর্থাৎ ইউরোপের নতুন বার্তা পরিষ্কার, “ইমিগ্রেশন থাকবে, কিন্তু নিয়ন্ত্রিত ইমিগ্রেশন।”


