বিশ্ব সুখ সূচকে টানা কয়েক বছর শীর্ষে থাকা ফিনল্যান্ড বর্তমানে গভীর বেকারত্ব সংকটে পড়েছে। বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক অসুখে জর্জরিত হয়ে পড়েছে বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশ হিসেবে পরিচিত এই নর্ডিক রাষ্ট্রটি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোর মধ্যে বর্তমানে ফিনল্যান্ডেই বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি, এমন তথ্য উঠে এসেছে ইউরোপীয় কমিশনের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাট-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে। গত বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) প্রকাশিত ওই জরিপে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ফিনল্যান্ডে বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৬ শতাংশে। একই সময়ে দেশটিতে প্রায় আড়াই লাখের বেশি মানুষ কর্মহীন ছিলেন। এর ফলে বেকারত্বের তালিকায় ফিনল্যান্ড ইইউভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে উঠে এসেছে। এর আগে দীর্ঘদিন ধরে এই অবস্থানে ছিল স্পেন। বিশ্লেষকদের মতে, ২০০৯ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার পর এই প্রথম ফিনল্যান্ডে বেকারত্বের হার এত উচ্চমাত্রায় পৌঁছাল।
এটি শুধু সাময়িক ওঠানামা নয়; বরং ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় ফিনল্যান্ডের অর্থনৈতিক দুরবস্থারই প্রতিফলন। ইউরোস্ট্যাটের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, একই সময়ে নেদারল্যান্ডসে বেকারত্বের হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশ, আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় বেকারত্বের হার ছিল ৬ শতাংশ। অর্থাৎ ফিনল্যান্ডের বেকারত্বের হার ইইউ গড়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইউরোপের দক্ষিণাঞ্চলের যেসব দেশে ঐতিহ্যগতভাবে বেকারত্ব বেশি ছিল, যেমন স্পেন ও গ্রিস, সেসব দেশ গত এক দশকে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। বিপরীতে, ফিনল্যান্ড ও প্রতিবেশী সুইডেনে বেকারত্বের হার উল্টো পথে এগিয়েছে, যা অর্থনীতিবিদদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন…
ফিনল্যান্ডে বেকারত্ব বৃদ্ধির একটি বড় কারণ হলো শ্রমবাজারের আকার হঠাৎ বড় হয়ে যাওয়া। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে বিদেশ থেকে অভিবাসীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, ফলে মোট শ্রমশক্তিও বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে এই প্রবণতা এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন ফিনিশ অর্থনীতি মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, শিল্প উৎপাদন ও নির্মাণ খাত স্থবির, এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি তুলনামূলকভাবে কঠিন হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তি, নির্মাণ ও পরিষেবা খাতে চাকরির সুযোগ কমে যাওয়ায় দেশীয় নাগরিকদের পাশাপাশি অভিবাসীরাও বেকারত্বের ঝুঁকিতে পড়ছেন। এ ছাড়া ফিনল্যান্ড সরকারের সাম্প্রতিক কিছু কঠোর অভিবাসন ও কল্যাণনীতি অভিবাসীদের জীবনযাপন আরও কঠিন করে তুলেছে বলে অভিযোগ তুলেছে বিভিন্ন অভিবাসী সংগঠন। তাদের দাবি, সামাজিক সহায়তা কমানো ও কাজের অনুমতি সংক্রান্ত নিয়ম কঠোর হওয়ায় কর্মহীন অভিবাসীরা দ্বিগুণ চাপের মুখে পড়ছেন।
ইউরোস্ট্যাটের এই হতাশাজনক চিত্রের মধ্যেও ফিনল্যান্ডের অর্থনৈতিক বিষয়ক ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় আশার কথা শোনাচ্ছে। এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত এক বছরে দেশটিতে মোট কর্মসংস্থানের সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার বেড়েছে এবং নির্দিষ্ট কিছু খাতে—বিশেষ করে সবুজ জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা ও ডিজিটাল প্রযুক্তি খাতে—নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের মতে, চলমান অর্থনৈতিক সংস্কার ও বিনিয়োগ পরিকল্পনার ফলে আগামী ১২ মাসের মধ্যে ফিনল্যান্ডের শ্রমবাজার পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থনৈতিক চাপ ও বেকারত্ব বাড়লেও ফিনল্যান্ড এখনো বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশ হিসেবে বিবেচিত, এই বৈপরীত্যই নতুন করে প্রশ্ন তুলছে সুখের সংজ্ঞা নিয়ে। বিশ্লেষকদের মতে, শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় সরকারি বিনিয়োগ এবং জীবনযাত্রার ভারসাম্য ফিনল্যান্ডের নাগরিকদের মানসিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সহায়তা করছে। তবে তারা সতর্ক করে বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ বেকারত্ব অব্যাহত থাকলে এই সুখের ভিত্তিও নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে।


