ইউরোপে রমজান এখন আর শুধু একটি ধর্মীয় ইবাদতের মাস নয়, এটি ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে পরিচয়, নাগরিকত্ব এবং সহাবস্থানের এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায়। যে মহাদেশে একসময় মুসলিমদের উপস্থিতি নিয়ে তীব্র বিতর্ক ছিল, সেই ইউরোপেই এখন রমজানকে কেন্দ্র করে উঠে আসছে নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক বার্তা। প্রশ্ন উঠছে মুসলিম হওয়া আর ইউরোপীয় হওয়া কি একসাথে সম্ভব? নাকি এই দুই পরিচয়ের মধ্যে এখনও অদৃশ্য দেয়াল রয়ে গেছে?
ফ্রান্স থেকে জার্মানি, ইতালি থেকে বেলজিয়াম- রমজানকে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং নাগরিক প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে: মুসলিমরা ইউরোপের বাইরের কেউ নয়, বরং ইউরোপেরই নাগরিক। ফ্রান্সে মুসলিমদের রোজা শুরুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বার্তা এই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। ধর্মনিরপেক্ষতার কঠোর নীতির জন্য পরিচিত দেশটিতেও এখন মুসলিমদের ধর্মীয় চর্চাকে সামাজিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জার্মানিতে খ্রিস্টান চার্চ নেতাদের পক্ষ থেকে মুসলিমদের জন্য রমজানের শুভেচ্ছা এবং সংহতির বার্তা ইউরোপের পরিবর্তিত চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে। তাদের বক্তব্যে বলা হয়েছে-রোজা, আত্মসংযম, দান এবং শান্তির শিক্ষা শুধু ইসলাম নয়, মানবতারও অভিন্ন মূল্যবোধ। এই ধরনের বক্তব্য শুধু ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তা নয়, বরং একটি রাজনৈতিক সংকেত ইউরোপ তার বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়কে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে।
প্যারিসের গ্র্যান্ড মসজিদ থেকেও দেওয়া হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান। সেখানে মুসলিমদের বলা হয়েছে ধর্ম পালন এবং রাষ্ট্রের সক্রিয় নাগরিক হওয়া পরস্পরবিরোধী নয়। বরং একজন মুসলিম একই সাথে একজন দায়িত্বশীল ইউরোপীয় নাগরিক হতে পারে। এই বার্তা মূলত তাদের জন্য, যারা মনে করেন ইসলাম ও ইউরোপীয় মূল্যবোধ একসাথে চলতে পারে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউরোপে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্মের মুসলিমদের জন্য এই রমজান একটি প্রতীকী সময়। তারা আর শুধু অভিবাসী পরিবারের সন্তান নয়, তারা ইউরোপের ভাষায় কথা বলে, ইউরোপের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় হয় এবং একই সাথে ইসলামের ধর্মীয় পরিচয় ধারণ করে। ফলে তাদের পরিচয় এখন দ্বৈত নয়, বরং একটি সমন্বিত বাস্তবতা।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। ইউরোপের কিছু দেশে এখনও ইসলামোফোবিয়া, হিজাব বিতর্ক, মসজিদ নির্মাণ নিয়ে রাজনৈতিক মতবিরোধ রয়েছে। কিন্তু এর মাঝেও রমজান ঘিরে যে সংহতির বার্তা আসছে, তা দেখাচ্ছে, সহাবস্থানের নতুন পথ তৈরি হচ্ছে। রাজনৈতিক ভাষায় মুসলিমরা আর “অন্য” নয়, বরং “আমাদের সমাজের অংশ” এই ধারণা শক্তিশালী হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় দিক হলো রমজান এখন ইউরোপের শহরগুলোতেও দৃশ্যমান। ইফতার আয়োজন, উন্মুক্ত মসজিদ, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ ,এসব আয়োজন শুধু মুসলিমদের জন্য নয়, বরং পুরো সমাজকে যুক্ত করছে। ফলে রমজান একটি ধর্মীয় সময়ের পাশাপাশি হয়ে উঠছে সামাজিক সংহতির প্রতীক।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ইউরোপে রমজান আজ একটি নতুন বার্তা দিচ্ছে মুসলিম পরিচয় এবং ইউরোপীয় নাগরিকত্ব একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। বরং এই দুই পরিচয়ের মিলনেই তৈরি হচ্ছে নতুন ইউরোপ, যেখানে বৈচিত্র্যই শক্তি।


