গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ন্যাটোর সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতির কথা জানিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর আরোপের পরিকল্পিত শুল্ক স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে (ডব্লিউইএফ) দেওয়া বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পরই এই সিদ্ধান্ত জানান তিনি।
ডাভোসে দেওয়া বক্তৃতায় ট্রাম্প পুনরায় দাবি করেন, জাতীয় ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ভাষায়, ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো চাইলে গ্রিনল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে সম্মত হতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র খুবই কৃতজ্ঞ থাকবে।
বুধবার গভীর রাতে দেওয়া ঘোষণায় ট্রাম্প বলেন, আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, এমন আটটি ইউরোপীয় দেশের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে না। ডাভোসে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে আলোচনায় অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে তিনি এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, ডাভোসে হওয়া আলোচনার মাধ্যমে তিনি ও মার্ক রুটে গ্রিনল্যান্ড বিষয়ে ভবিষ্যৎ একটি চুক্তির ‘ফ্রেমওয়ার্কে’ পৌঁছেছেন। তাঁর দাবি, সম্ভাব্য এই চুক্তি শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং ন্যাটোর সব সদস্য দেশের জন্যই লাভজনক হবে।
নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, এই সমঝোতার ভিত্তিতে আমি ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল এমন শুল্ক আরোপ করছি না।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের আগে ঘোষিত শুল্ক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ডেনমার্ক, সুইডেন, নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস এবং আরও একটি ইউরোপীয় দেশের পণ্যের ওপর শুরুতে ১০ শতাংশ হারে শুল্ক বসানোর কথা ছিল, যা জুনের মধ্যে বেড়ে ২৫ শতাংশে পৌঁছানোর পরিকল্পনা ছিল।
এর আগে ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন, ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়ার পক্ষে ইউরোপীয় দেশগুলোর সমর্থন না পাওয়া পর্যন্ত এই শুল্ক বহাল থাকবে। তাঁর এই অবস্থানকে ইউরোপীয় নেতারা অর্থনৈতিক চাপ ও কূটনৈতিক ব্ল্যাকমেইল হিসেবে দেখছিলেন।
ট্রাম্প জানান, গ্রিনল্যান্ড সংক্রান্ত ভবিষ্যৎ আলোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফসহ অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের। তারা সবাই সরাসরি প্রেসিডেন্টের কাছে রিপোর্ট করবেন।
ডাভোসে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প আবারও বলেন, জাতীয় ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন। তবে একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে জানান, গ্রিনল্যান্ড দখলে সামরিক শক্তি ব্যবহারের কোনো পরিকল্পনা নেই।
অন্যদিকে, ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে দাভোসে দেওয়া বক্তব্যে বিবেচনাপ্রসূত কূটনীতির আহ্বান জানান। তিনি স্বীকার করেন, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে জোটের ভেতরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তবে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বের করার ব্যাপারে ন্যাটো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এর আগে চলতি সপ্তাহেই ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রুটের পাঠানো একটি ব্যক্তিগত বার্তা প্রকাশকরেন, যেখানে ন্যাটো মহাসচিব এই সংকট নিরসনে কাজ করার অঙ্গীকার করেছিলেন।
ট্রাম্পের শুল্ক-হুমকির জেরে ইউরোপীয় ইউনিয়নে জরুরি বৈঠকের ডাক দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা শুরু হয়।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘অ্যান্টি-কোয়ারশন ইনস্ট্রুমেন্ট’ বা অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলার শক্তিশালী বাণিজ্যিক হাতিয়ার ব্যবহারের পক্ষে মত দেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন সতর্ক করে বলেন, ইইউর প্রতিক্রিয়া হবে দৃঢ়, ঐক্যবদ্ধ এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, গ্রিনল্যান্ড ঘিরে ট্রাম্পের এই কৌশল যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে গভীর কূটনৈতিক বিভাজন সৃষ্টি করেছে। যদিও সাম্প্রতিক ‘ফ্রেমওয়ার্ক’ সমঝোতায় আপাতত শুল্ক-সংকট এড়ানো গেছে, তবে গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ ও যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ সম্পর্ক কোন পথে এগোবে, সেদিকে তাকিয়ে আছে বিশ্ব রাজনীতি।


