ফ্রান্স ও স্পেনের সীমান্তবর্তী ভূমধ্যসাগরঘেঁষা অঞ্চল পিরেনে-ওরিয়ঁতাল ডিপার্টমেন্টে অনিয়মিত অভিবাসন প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফরাসি প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এ অঞ্চলে অনিয়মিতভাবে অবস্থানরত ৮ হাজার ৩৩৫ জন বিদেশিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, যা আগের বছর ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ বেশি।
পিরেনে-ওরিয়ঁতাল প্রেফেকচুরের প্রকাশিত বিবৃতিতে জানানো হয়, জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা অভিবাসীদের মধ্যে ৫ হাজার ১৮৯ জনকে ফ্রান্স-স্পেনের দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় পুনরায় স্পেনে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ৬৯০ জনকে ফ্রান্সে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। এই অভিবাসীদের সাধারণত সীমান্তবর্তী বিশেষ নিয়ন্ত্রিত এলাকা ‘জোন দাতঁত’-এ রাখা হয়, যা সীমান্ত পুলিশ (পিএএফ), জঁদারমেরি অথবা জাতীয় পুলিশের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।
স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে সেরবের গ্রামে, যা ফ্রান্সের পার্পিনিয়ঁ শহরের দক্ষিণে স্পেন সীমান্তসংলগ্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট। ভূমধ্যসাগরঘেঁষা এই রুটটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনিয়মিত সীমান্ত পারাপারের অন্যতম প্রধান পথ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০২১ সালেই সেরবের এলাকায় রেকর্ড ১৩ হাজার অনিয়মিত অভিবাসীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। সে সময় তৎকালীন প্রেফে এতিয়েন স্তসকপফ মন্তব্য করেছিলেন, সেরবের ধীরে ধীরে অনিয়মিত অভিবাসী পারাপারের একটি হটস্পটে পরিণত হচ্ছে।
প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা অভিবাসীদের বড় একটি অংশ এসেছে, আলজেরিয়া, মরক্কো, সাব-সাহারান আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ, দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি দেশ থেকে। এই চিত্র ভূমধ্যসাগরীয় রুটে বৈচিত্র্যময় অভিবাসন প্রবাহের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সীমান্ত পুলিশের (পিএএফ) কার্যালয় পরিদর্শনকালে স্থানীয় প্রশাসক বলেন, অভিবাসন চাপ বাড়ছে, তবে আমাদের সক্ষমতা ও সেবার মান আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী হয়েছে। তিনি স্পেনের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা ও যৌথ অভিযানের বিষয়টিও তুলে ধরেন। প্রেফেকচুরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দুই দেশের সীমান্তবর্তী সব আন্তঃসীমান্ত ট্রেনে মোট ৪৩৬টি যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
কেবল অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ নয়, মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধেও জোরালো পদক্ষেপ নিয়েছে প্রশাসন। ২০২৫ সালে ১০টি মানবপাচার চক্র ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং ১৭২ জন পাচারকারী বর্তমানে বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় রয়েছেন। প্রশাসনের মতে, এই সংখ্যা প্রমাণ করে যে অঞ্চলটি মানবপাচারকারীদের কাছে এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট।
২০২৫ সালে পিরেনে-ওরিয়ঁতাল ডিপার্টমেন্টে মোট ২ হাজার ২০৭টি বহিষ্কার আদেশ জারি করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৭ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ৪৩১টি আদেশ কার্যকর হয়েছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৩১ শতাংশ বৃদ্ধি। প্রেফেকচুরের দাবি অনুযায়ী, এই বিভাগের বহিষ্কারের হার জাতীয় গড়ের চেয়ে ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। তবে শুধুই কঠোরতার চিত্র তুলে ধরেননি প্রেফে। তিনি বলেন, পিরেনে-ওরিয়ঁতালে প্রায় ২০ হাজার বিদেশি বৈধভাবে বসবাস করছেন। কঠোরতা ও আকর্ষণ একে অপরের বিরোধী নয়।
প্রেফেকচুর জানায়, ২০২৫ সালে বিভাগটিতে ৪ হাজার ৫০০টি রেসিডেন্স পারমিট দেওয়া হয়েছে, যার বেশিরভাগই ছিল নবায়ন। তবে ‘রোতাইয়ো সার্কুলার’-এর আওতায় কোনো ব্যতিক্রমী আবাসন অনুমতি (এইএস) দেওয়া হয়নি। প্রেফেকচুরের বিবৃতিতে পিরেনে-ওরিয়ঁতালকে, গোটা ফরাসি ভূখণ্ডের জন্য একটি বড় দায়িত্ব পালনকারী অঞ্চল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
এদিকে, আটলান্টিক মহাসাগরীয় রুটও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত ইরুন ও অঁদায়ে হয়ে অনিয়মিত অভিবাসীদের একটি বড় অংশ ফ্রান্সে প্রবেশ করেন। পিরেনে-আতলান্তিক বিভাগের প্রেফে জঁ-মারি জিরিয়ে জানান, ২০২৫ সালের শুরুতে এই বিভাগটি ফ্রান্সে অনিয়মিত অভিবাসনের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার ছিল। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই সেখানে ১৭ জন পাচারকারীকে আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আর ২০২৪ সালে পুরো বছরে অন্তত ৫০ জন পাচারকারী গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
সব মিলিয়ে স্পেন-ফ্রান্স সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলগুলোতে অনিয়মিত অভিবাসন, মানবপাচার ও সীমান্ত নিরাপত্তা, তিনটি ইস্যুই একসঙ্গে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফরাসি প্রশাসন বলছে, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আইনি অভিবাসন ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে, তবে বাস্তবতায় এই চাপ সামাল দেওয়া আগামীতেও কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


