মানুষের মস্তিষ্ক কেবল বাইরের জগতকে চেনে না, বরং এটি নিজেই একটি উন্নত নেভিগেশন সিস্টেম হিসেবে কাজ করে—এমনটাই প্রমাণ করেছেন ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডক্টর ক্রিশ্চিয়ান ডোলার। তার এই যুগান্তকারী গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি সম্প্রতি ২৫ লাখ ইউরো মূল্যের গটফ্রাইড উইলহেম লাইবনিজ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
অধ্যাপক ডোলার ও তার দল ‘ডোলারল্যাব’-এ দীর্ঘকাল ধরে অনুসন্ধান করছেন যে, মানুষের চিন্তাভাবনাকে সম্ভব করার পেছনে মস্তিষ্কের মূল কোডিং নীতিগুলো কী। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ যখন কোনো ভার্চুয়াল শহরে ট্যাক্সি চালানোর মতো জটিল নেভিগেশনাল কাজ সম্পন্ন করে, তখন তাদের মস্তিষ্কের স্মৃতি ও শিক্ষা সক্রিয়ভাবে একটি নেভিগেশন সিস্টেমের মতো কাজ করে সংক্ষিপ্ততম পথ খুঁজে বের করে।
অধ্যাপক ডোলারের মতে, মস্তিষ্কের এই নেভিগেশন সিস্টেমটি কেবল পথ চেনাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি মানুষের স্মৃতি, শিক্ষা এবং জ্ঞানকেও সুসংগঠিত করে। তিনি বিষয়টিকে স্কুল জীবনের ইনডেক্স কার্ড বা ডেস্কের বিভিন্ন স্থানে রাখা খবরের কাগজের নিবন্ধের সাথে তুলনা করেছেন। অর্থাৎ, আমরা যখন কোনো তথ্য মনে রাখার জন্য স্থানিক বা ‘স্পেশিয়াল’ কৌশল ব্যবহার করি, তখন আমাদের মস্তিষ্কের এই নেভিগেশনাল সার্কিটটি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ২০১০ সালে তিনি মানুষের মস্তিষ্কে ‘গ্রিড সেল’-এর কার্যকারিতা প্রথমবারের মতো প্রমাণ করে বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলেছিলেন, যা আগে কেবল ইঁদুরজাতীয় প্রাণীদের মধ্যে দেখা যেত। ডোলারের এই গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে, মানুষের স্থানিক উপলব্ধি এবং অবস্থান নির্ণয়ের পদ্ধতি প্রাণিজগতের অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মতোই।
লাইবনিজ পুরস্কারের এই বিশাল অংকের অর্থ দিয়ে অধ্যাপক ডোলার এখন আরও জটিল ও রোমাঞ্চকর গবেষণা চালিয়ে নিতে চান। তার পরবর্তী লক্ষ্য হলো, দুজন মানুষকে একই সাথে দুটি ভিন্ন স্ক্যানারে রেখে তাদের সামাজিক মিথস্ক্রিয়া এবং যৌথ শিক্ষা প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা। প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত জটিল এই পরীক্ষাটি সফল হলে মস্তিষ্ক কীভাবে সামাজিক সম্পর্ক এবং পারস্পরিক জ্ঞান বিনিময় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে, সে সম্পর্কে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। এছাড়া তার দল বর্তমানে আলঝেইমার রোগের প্রাথমিক পর্যায় এবং লং কোভিডের প্রভাব নিয়েও ক্লিনিক্যাল স্টাডি চালিয়ে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে এই রোগগুলোর চিকিৎসায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
পরিশেষে, অধ্যাপক ডোলার বিশ্বাস করেন যে মস্তিষ্কের এই নেভিগেশনাল সিস্টেমটিই আমাদের নতুন ধারণা শিখতে এবং জ্ঞান গড়ে তুলতে সাহায্য করে। সমাজবিজ্ঞানী নিকলাস লুহম্যানের নোট গুছিয়ে রাখার বক্স যেমন তার মস্তিষ্কের প্রতিফলন ছিল, আমাদের মস্তিষ্কের এই অভ্যন্তরীণ নেভিগেশন সিস্টেমটিও ঠিক সেভাবেই আমাদের জীবনের সব তথ্য ও অভিজ্ঞতাকে একটি সুশৃঙ্খল মানচিত্রে সাজিয়ে রাখে। ডোলারের এই জয় কেবল একজন বিজ্ঞানীর সাফল্য নয়, বরং মানুষের চিন্তার অলিগলি বোঝার পথে বিজ্ঞানের এক বিশাল ধাপ।


