ভেনিসভিত্তিক মোরেসা ফাউন্ডেশন-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত এক দশকে ইতালির ব্যবসায়িক পরিবেশে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে অভিবাসীদের উদ্যোগের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা দেশীয় অর্থনীতি এবং সামাজিক কাঠামোর উপর স্পষ্ট প্রভাব ফেলেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিবাসীদের পরিচালিত ব্যবসার সংখ্যা গত দশ বছরে ২০শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে একই সময়ে স্থানীয় মালিকানাধীন ব্যবসা ৪.৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এই ব্যবধান ইঙ্গিত করছে যে ইতালির অর্থনীতিতে অভিবাসী উদ্যোক্তাদের ভূমিকা ক্রমবর্ধমান এবং তা দেশের ব্যবসায়িক প্রেক্ষাপটকে পুনঃসংজ্ঞায়িত করছে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, অভিবাসী উদ্যোক্তারা মূলত খাদ্য ও আতিথেয়তা, নির্মাণ, খুচরা বাণিজ্য এবং ছোট শিল্প উদ্যোগে সক্রিয়। ইটালির বিভিন্ন শহরে অভিবাসী মালিকানাধীন রেস্তোরাঁ, কফি শপ, হোটেল ও খাবারের স্টলগুলো শুধুমাত্র ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টি করছে, বরং স্থানীয় অর্থনীতি এবং সামাজিক মিলনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। খাদ্য খাতের ক্ষেত্রে তাদের উদ্যোগ ইতালীয় খাদ্য সংস্কৃতির সঙ্গে বৈচিত্র্য আনছে, যেমন বাংলাদেশি, ভারতীয়, আফ্রিকান এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্বাদ ও পণ্যের সংমিশ্রণ।
নির্মাণ ও খুচরা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে, অভিবাসী উদ্যোক্তারা কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি আকারের ব্যবসা যেখানে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সীমিত আকারের উদ্যোগ পরিচালনা করতে সক্ষম, সেখানে অভিবাসীরা নতুন উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছে। ফলে এই খাতে শ্রমিক সংকট কমানো এবং বাজার সম্প্রসারণে অভিবাসী উদ্যোগের অবদান স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
মোরেসা ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনের আলোকে দেখা যায়, অভিবাসী উদ্যোগের দ্রুত বৃদ্ধি ইতালির অর্থনীতিতে সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলছে। সরাসরি প্রভাব হিসেবে দেখা যাচ্ছে যে নতুন ব্যবসার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু শহরে অভিবাসী উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত নতুন কর্মী নিয়োগ হয়েছে। এটি শুধু স্থানীয় বাজারকে শক্তিশালী করছে না, বরং জ্যেষ্ঠ বা বয়স্ক শ্রমিকের অভাবও কিছুটা পূরণ করছে।
পরোক্ষ প্রভাব হিসেবে, অভিবাসী উদ্যোক্তাদের বৃদ্ধি স্থানীয় অর্থনৈতিক কার্যক্রমে উদ্ভাবনের সংস্কৃতিকে উৎসাহ দিচ্ছে। তারা নতুন পণ্য, সেবা এবং ব্যবসায়িক মডেল প্রবর্তন করছে, যা ইতালির অর্থনীতিকে গতিশীল করে তুলছে। বিশেষ করে খাদ্য ও আতিথেয়তা খাতে, বহুজাতিক খাবারের সংমিশ্রণ স্থানীয় গ্রাহকদের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছে। এছাড়া তাদের উদ্যোগ স্থানীয় সরবরাহ চেইনকে শক্তিশালী করছে, মশলা, খাদ্য উপকরণ, নির্মাণ সামগ্রী এবং সেবা সরবরাহে নতুন চাহিদা তৈরি হচ্ছে।
অভিবাসী উদ্যোগের বৃদ্ধি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও এর প্রভাব স্পষ্ট। বিভিন্ন শহরে অভিবাসী ব্যবসায়ীরা স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খাদ্য উৎসব এবং কমিউনিটি ইভেন্টে অংশ নিচ্ছে। এটি শুধু অর্থনৈতিক সংহতি নয়, বরং সামাজিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াচ্ছে। স্থানীয় ও অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পর্ক দৃঢ় হচ্ছে এবং বহুসংস্কৃতিক সমন্বয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
রিপোর্টে বিশেষভাবে উল্লেখ আছে যে, অভিবাসী উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক উদ্যোগ যুব সম্প্রদায়কে প্রেরণা দিচ্ছে। তরুণরা দেখতে পাচ্ছে যে দক্ষতা, উদ্যোগ এবং উদ্ভাবন দিয়ে ব্যবসায়িক সফলতা অর্জন করা সম্ভব। এতে নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তা মানসিকতা তৈরি হচ্ছে এবং তারা স্থানীয় অর্থনীতিতে অংশগ্রহণে আগ্রহী হচ্ছে।
তবে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য চ্যালেঞ্জও কম নয়। দেশীয় ব্যবসার হ্রাস এবং অভিবাসী উদ্যোগের দ্রুত বৃদ্ধি নীতি নির্ধারণে নতুন জটিলতা তৈরি করছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অনেক সময় মনে করছেন যে অভিবাসী উদ্যোগের সুবিধা গ্রহণ করে তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। সরকারের জন্য এই পরিস্থিতি সমন্বয় এবং নীতিগত সমাধানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিবাসী উদ্যোগের বৃদ্ধি ইতালির অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক হলেও, স্থানীয় ব্যবসার সুরক্ষা, করনীতি এবং শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণে সমন্বয় প্রয়োজন। নীতি গ্রহণ ও প্রশাসনিক সহায়তার মাধ্যমে দেশীয় ও অভিবাসী উদ্যোক্তাদের মধ্যে ভারসাম্য রাখা সম্ভব হলে অর্থনীতি আরও স্থিতিশীল হবে।
মোটের উপর, মোরেসা ফাউন্ডেশনের রিপোর্ট স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে অভিবাসী উদ্যোক্তারা ইতালির ব্যবসায়িক ও সামাজিক দৃশ্যপটকে পুনঃসংজ্ঞায়িত করছেন। তারা শুধু অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে পুনরুজ্জীবিত করছেন না, শ্রমিক সংকট পূরণ করছেন, নতুন উদ্ভাবন নিয়ে আসছেন, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বহুমুখিতা বৃদ্ধি করছেন। এই প্রবণতা ইতালির অর্থনীতি, স্থানীয় সম্প্রদায় এবং সামাজিক কাঠামোর জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।
যদি দেশীয় ব্যবসা এবং অভিবাসী উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা যায়, তবে ইতালি ভবিষ্যতে আরও সৃজনশীল, বহুমুখী এবং স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে। এটি শুধু অভিবাসীদের জন্য নয়, সমগ্র দেশের জন্যই লাভজনক, যা দেশকে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক মঞ্চে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।


