ইউরোপে অনিয়মিত অভিবাসন ঠেকাতে সবচেয়ে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে ইতালি। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে নৌকায় করে প্রবেশ ঠেকাতে নতুন আইন, সীমান্ত নজরদারি ও দ্রুত ফেরত পাঠানোর নীতিমালা কার্যকর করছে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি নেতৃত্বাধীন সরকার। এই নীতির মূল বার্তা স্পষ্ট, সমুদ্রপথে পৌঁছালেই আর আশ্রয়ের সুযোগ নয়, বরং আটক ও বহিষ্কার করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত এক দশকে ইউরোপমুখী অভিবাসনের যে পথ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে, সেই ভূমধ্যসাগর রুট এখন কার্যত বন্ধ করার দিকে যাচ্ছে ইতালি।
নতুন বিধান অনুযায়ী, ইতালির নৌবাহিনী অভিবাসীবাহী নৌকা শনাক্ত করলেই থামাবে এবং প্রয়োজনে সমুদ্রেই ঘুরিয়ে দেওয়া হবে। এছাড়া জরুরি পরিস্থিতিতে সাময়িক নৌ অবরোধ চালু করা যাবে। উপকূলে পৌঁছালে সরাসরি আটক শিবিরে নেওয়া হবে। পরিচয় যাচাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে মুক্তি দেওয়া হবে না এবং মানবপাচারকারীদের ব্যবহৃত নৌকা জব্দ করা হবে।
অনেক ক্ষেত্রে ইতালিতে না রেখেই এসব অভিবাসীদের নিরাপদ তৃতীয় দেশে পাঠানো হবে। দ্রুত ডিপোর্টেশন প্রক্রিয়া ও পুনরায় প্রবেশে কয়েক বছরের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে। এছাড়া উদ্ধার করার পর নির্দিষ্ট বন্দরে যেতে বাধ্য করা হবে এবং নির্দেশ না মানলে জরিমানা ও জাহাজ জব্দ করা হবে।
গত কয়েক বছরে লিবিয়া-তিউনিসিয়া উপকূল থেকে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা বাড়ে। বিশেষ করে ইতালির দক্ষিণ উপকূল দ্বীপ লামপেদুসা প্রায়শই হাজার হাজার অভিবাসীর চাপের মুখে পড়ে।
সরকারের যুক্তি, মানবপাচার চক্র ভাঙা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও স্থানীয় রাজনীতিতে জনচাপ। ডানপন্থি ভোটারদের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রপথে অভিবাসন বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছিল। নতুন ব্যবস্থা শুধু ইতালির একক সিদ্ধান্ত নয়, এটি বৃহত্তর ইউরোপীয় ইউনিয়ন অভিবাসন সংস্কারের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইইউ এখন পৌঁছানোর পর আশ্রয় নীতি থেকে পৌঁছানোর আগেই প্রতিরোধ নীতিতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ থেকে অনেক অভিবাসী উত্তর আফ্রিকা হয়ে সমুদ্রপথে ইতালিতে ঢোকার চেষ্টা করে। নতুন নীতির ফলে, লিবিয়া থেকে নৌকা ছাড়লেও ইতালিতে নামতে নাও দেওয়া হতে পারে। আর কোনোভাবে পৌঁছালেও আশ্রয় পাওয়া কঠিন হবে। এসব অভিবাসীদের আটক করে দ্রুত ফেরত পাঠানো হতে পারে এবং ইউরোপে ভবিষ্যতে ভিসা পাওয়াও তাদের জন্য কঠিন হয়ে যাবে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ছিল সাগর, এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি আইন।
তবে, একই সঙ্গে ইতালি বৈধ শ্রমিক নেওয়ার পরিকল্পনা চালু রেখেছে। কৃষি, নির্মাণ ও সেবা খাতে বিদেশি কর্মী প্রয়োজন হওয়ায় ওয়ার্ক ভিসা কোটা বাড়ানোর আলোচনা চলছে। অর্থাৎ বার্তা দ্বৈত, অবৈধ পথে শূন্য সহনশীলতা ও বৈধ পথে নিয়ন্ত্রিত প্রবেশ।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, এতে আশ্রয় চাওয়ার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং সমুদ্রে বিপদে পড়া মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়া আন্তর্জাতিক আইনের বিরুদ্ধে হতে পারে। এবিষয়ে সরকারের জবাব, মানবপাচার বন্ধ করাই তাদের এই মানবিক পদক্ষেপ।
ইতালির নতুন নীতি ইউরোপগামী অভিবাসনের বাস্তবতা পাল্টে দিচ্ছে। আগে গন্তব্যে পৌঁছানো মানেই সুযোগ, এখন পৌঁছানো মানেই আটক। ফলে সমুদ্রপথে ইউরোপ যাওয়ার প্রচলিত রুট কার্যত ভেঙে পড়ার পথে।


