ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় শহর মিলান-এ শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) বিকেলের দিকে একটি ট্রাম লাইনচ্যুত হয়ে কেন্দ্রীয় শহরের ভিট্টোরিও ভেনেটো রাস্তায় একটি ভবনের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে কমপক্ষে দু’জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৪০ জনেরও বেশি লোক আহত হয়েছেন। এই মারাত্মক দুর্ঘটনার ফলে স্থানীয় সময় বিকাল ৪টার মতো (স্থানীয় সময়) শহরের প্রাণকেন্দ্রে বিশাল ঝড়ের মতো আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং উদ্ধার কাজে প্রায় সোয়া ডজনের বেশি অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিস কর্মী ব্যস্ত ছিলেন।
স্থানীয় পুলিশ ও কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল প্রোটেকশন টিম তৎক্ষণাত উদ্ধার অভিযান শুরু করে, আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানিয়েছে চিকিত্সকরা। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে যে কমপক্ষে দেড় ডজনেরও বেশি লোকের মধ্যে গুরুতর চোট রয়েছে এবং বাকিরা হালকা আঘাত পেয়েছেন।
স্থানীয় মেয়র বেপে সালা দুর্ঘটনার পর সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনাটি হয়তো মানবিক ভুল বা পরিচালনাগত ভুল–এর কারণে ঘটতে পারে। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে এটি কোনো সরাসরি প্রযুক্তিগত ত্রুটি বলে মনে হচ্ছে না, বরং এটি চালকের ভুল সিদ্ধান্ত বা যথাযথ ট্র্যাক সুইচ না ব্যবহার করার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। যদিও তদন্ত এখনো চলছে এবং তা থেকে তিনি আশা করছেন আরও নির্দিষ্ট কারণ জানা যাবে।
দুর্ঘটনাটি ঘটে তখন ট্রামটি ভিট্টোরিও ভেনেটো রাস্তায় গন্তব্যের পথে চলছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন যে ট্রামটি তীব্র গতিতে চলছিল এবং নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রথমে রাস্তার পাশে থাকা একটি দোকানের জানালা ভেঙে দেয় এবং পরে ভবনের সাথে আঘাত করে থামে। অনেক যাত্রী ট্রাম থেকে ছিটকে পড়েন এবং ভয়াবহ হইচই সৃষ্টি হয়। এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, আমি তখন অফিসে ছিলাম এবং হঠাৎ এক বিশাল শব্দ শুনলাম, আমি মনে করেছিলাম যেন ভূমিকম্প হচ্ছে। ট্রামটি দোকানের ভেতর ঢুকে পড়েছিল।
ঘটনাস্থল ছেড়ে উদ্ধারকর্মীরা দ্রুত আহতদের হাত গরম করে এবং পরিবহন সংস্থা ও নিরাপত্তা বাহিনী আহতদের পরিচয় ও অবস্থার তথ্য সংগ্রহে ব্যস্ত। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে যে আহতদের মধ্যে অনেকেই ট্রামটির ভেতরে ছিলেন, আর কেউ কেউ রাস্তার পাশের ফুটপাথেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। একাধিক শিশুও আহতদের মধ্যে রয়েছেন বলে জানা গেছে, যদিও কতজন শিশু আহত হয়েছে তার নিশ্চিত পরিসংখ্যান এখনও পাওয়া যায়নি।
মিলানের গণপরিবহন কর্তৃপক্ষ-এটিএম (যা শহরের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সংগঠিত করে থাকে), এক বিবৃতিতে জানায়, ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় আমরা অত্যন্ত মর্মাহত এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করি। আমরা তদন্তকারীদের সাথে কাজ করছি যাতে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা যায়। তারা বলেছে যে ঘটনাস্থলে তাদের জরুরি সহায়তা ইউনিট এবং সংশ্লিষ্ঠ কর্মকর্তারা কাজ করছেন এবং আহতদের সেবা প্রদানে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।
অপরদিকে, ইতালীয় প্রধানমন্ত্রী জিওর্জিয়া মেলোনি দুর্ঘটনার খবর পেয়ে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন এবং নিহতদের পরিবার ও আহতদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, এটি একটি হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা এবং আমরা সংশ্লিষ্ট সবাইকে সহায়তা করব” এবং সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনার জন্য দেশের ট্রান্সপোর্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থার আরো উন্নতির প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছেন।
স্থানীয় আইনি কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যেই কাণ্ডে তদন্ত শুরু করেছে। অনুমান করা হচ্ছে যে ট্রামটি যখন ট্র্যাক সুইচের কাছে পৌঁছেছিল, তখন সঠিকভাবে সুইচটি সক্রিয় করা হয়নি, ফলে ট্রামটি ভুল পথ ধরে যাওয়ার কারণে লাইনচ্যুত হয়। যদিও এটি এখনো নিশ্চিত নয় এবং তদন্তের মাধ্যমে যথাযথ প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ চালানো হচ্ছে।
বেশ কিছু প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য থেকে জানা গেছে যে অনেক যাত্রী ট্রামটিতে উঠার পরপরই মনে হয়েছে গাড়িটি দ্রুত গতি বাড়াচ্ছে। আমি এরপরেই ভীষণ হঠাৎ ঝটকা অনুভব করি এবং তখন সব কিছুটা বাজের মতো হইচই শুরু হয়, এক যাত্রী সংবাদমাধ্যমকে বলেন। তার মতে, ট্রামটি স্বাভাবিক গতি সীমা অতিক্রম করছিল। যদিও ইতিলীয় নিরাপদযাত্রী সংস্থার পক্ষ থেকে কোন সুনির্দিষ্ট গতি তথ্য এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে উপস্থিত উদ্ধারকারী ইউনিটগুলো আহতদের চিকিৎসার পাশাপাশি সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এলাকাটি ঘিরে রেখেছে। আহতদের কয়েকজনকে জরুরি বিভাগের রেড কোড হিসেবে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে; যারা গুরুতর অবস্থায় রয়েছে তাদের অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
এদিকে স্থানীয় পরিবহন বিশ্লেষকদের মতে, মিলান গত কয়েক বছরে তার ট্রাম ও বাস সিস্টেমে আধুনিকীকরণ করেছে। সম্প্রতি চালু করা নতুন মডেলের ট্রামগুলো উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে এসেছে, কিন্তু দুর্ঘটনাটি প্রমাণ করে যে প্রযুক্তি থাকলেও নির্ভরযোগ্য পরিচালনা ও ট্র্যাক নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা। বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে কেবল প্রযুক্তি উন্নত করলেই নয়, বরং চালকদের প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা প্রটোকল আরও শক্তিশালী করতে হবে।
মিলান সম্প্রতি ২০২৬ সালের শীতকালীন অলিম্পিক গেমস সফলভাবে আয়োজন করেছিল এবং এখন প্যারালিম্পিক গেমস ও ফ্যাশন উইক-এর প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। এমন একটি সময়ে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনা শহরবাসী ও পর্যটকদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় প্রশাসন নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়নের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।
ঘটনার কারণে শহরের কিছু অংশে ট্রাম পরিষেবা সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে এবং অন্যান্য পাবলিক পরিবহন সেবা ব্যস্ত হলেও কিছুটা বিলম্বের সম্মুখীন হচ্ছে। স্থানীয় বাস ও ট্রেন পরিষেবাগুলো দুর্ঘটনার ব্যস্ততম সময়গুলোতে যাত্রীদের অন্য রুট ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছে।
এরকম মারাত্মক দুর্ঘটনা ইতালির পাবলিক ট্রান্সপোর্টের জন্য একটি বড় স্মরণীয় ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে, এবং কর্তৃপক্ষের কাছে এখন সঠিক কারণ সিদ্ধান্ত করে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা অতি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। তদন্ত চলমান এবং শীঘ্রই বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশ করার আশা করা হচ্ছে।


