ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে ক্রয়ক্ষমতার সূচকে পর্তুগাল সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে, এমন তথ্য সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। ইউরোপের উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, পর্তুগালের গড় আয় তুলনামূলকভাবে কম, অথচ জীবনযাত্রার ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলেছে। ফলে সাধারণ নাগরিকদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে ব্যয়ের চাপ বাড়ছে।
ইউরোপীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাট-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) গড় ক্রয়ক্ষমতাকে ১০০ ধরা হলে পর্তুগালের সূচক তার নিচে অবস্থান করছে। ক্রয়ক্ষমতা মূলত একজন নাগরিক তার আয়ের মাধ্যমে কত পরিমাণ পণ্য ও সেবা কিনতে সক্ষম, তা নির্দেশ করে। পর্তুগালের ক্ষেত্রে এই সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় দেশটি তালিকার নিচের দিকে অবস্থান করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মজুরি বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারাই এ অবস্থার প্রধান কারণ।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইউরোজোনভুক্ত দেশ হিসেবে পর্তুগাল একই মুদ্রা ব্যবহার করলেও অর্থনৈতিক কাঠামো, উৎপাদনশীলতা ও শিল্পায়নের মাত্রায় পিছিয়ে রয়েছে। শক্তিশালী শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি যেমন, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডস-এর তুলনায় পর্তুগালের অর্থনীতি বেশি নির্ভরশীল পর্যটন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও সেবাখাতের ওপর। পর্যটন খাত মৌসুমি হওয়ায় আয় স্থিতিশীল থাকে না, যা সামগ্রিক ক্রয়ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাড়িভাড়া ও আবাসন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, বিশেষ করে রাজধানী লিসবন এবং পোর্তো শহরে। বিদেশি বিনিয়োগ ও পর্যটকের চাপ বাড়ায় আবাসন বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু স্থানীয় নাগরিকদের গড় আয় একই হারে না বাড়ায় আবাসন ব্যয় তাদের আয়ের বড় অংশ গ্রাস করছে। এতে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অন্যান্য খাতে ব্যয় সংকুচিত হচ্ছে।
এছাড়া জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিও ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের অন্যতম কারণ। বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা, সরবরাহ সংকট এবং ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী জ্বালানি সংকট ইউরোপজুড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়েছে। যদিও ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার সমন্বয়ের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে, তবুও নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর এর চাপ রয়ে গেছে।
পর্তুগালের শ্রমবাজারে ন্যূনতম মজুরি তুলনামূলকভাবে কম। যদিও সরকার ধাপে ধাপে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি করেছে, তবুও তা পশ্চিম ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে। তরুণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ উচ্চশিক্ষা শেষে উন্নত মজুরির আশায় বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। ফলে দেশে দক্ষ শ্রমশক্তির ঘাটতি তৈরি হচ্ছে এবং উৎপাদনশীলতা কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ক্রয়ক্ষমতা কম থাকলেও পর্তুগালের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা খাতে সরকারি ভর্তুকি রয়েছে, যা নাগরিকদের কিছুটা সুরক্ষা দেয়। তবে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর ব্যয়ের চাপ বাড়ায় তাদের সঞ্চয় সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি বিনিয়োগ ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পর্তুগাল সরকার বলছে, অর্থনৈতিক সংস্কার, প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ ও স্টার্টআপ উন্নয়নের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পুনরুদ্ধার তহবিল থেকেও দেশটি উল্লেখযোগ্য সহায়তা পাচ্ছে। এসব বিনিয়োগ অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কাঠামোগত সংস্কার ও মজুরি বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে ক্রয়ক্ষমতার উন্নতি সম্ভব নয়।
সামগ্রিকভাবে, ইউরোপের মধ্যে পর্তুগালের ক্রয়ক্ষমতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি সতর্কবার্তা। আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে না পারলে সাধারণ নাগরিকদের জীবনমানের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। আগামী বছরগুলোতে সরকারের নীতিগত পদক্ষেপ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপরই নির্ভর করবে, পর্তুগাল এই চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে কতটা সক্ষম হবে।


