নাগরিকত্ব পাওয়ার নিয়ম আরও কঠোর করার পথে এগোচ্ছে সুইডেন। দেশটির ডানপন্থী সরকার নতুন একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে সুইডিশ নাগরিকত্ব অর্জনের শর্ত উল্লেখযোগ্যভাবে কড়াকড়ি করার ঘোষণা দিয়েছে। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে নাগরিকত্ব পেতে আবেদনকারীদের অন্তত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ করতে হবে, দীর্ঘ সময় বসবাস, নির্দিষ্ট আয়ের নিশ্চয়তা এবং সুইডিশ সমাজ সম্পর্কে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া।
সরকারি ঘোষণায় বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে সুইডিশ নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে হলে, অন্তত ৮ বছর সুইডেনে বসবাস করতে হবে (বর্তমানে যা ৫ বছর), ন্যূনতম মাসিক আয় ২০ হাজার সুইডিশ ক্রোনার থাকতে হবে এবং সুইডিশ ভাষা, সংস্কৃতি ও সমাজব্যবস্থা বিষয়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। এ ছাড়া আবেদনকারীর বিরুদ্ধে সুইডেন বা অন্য কোনো দেশে অপরাধের রেকর্ড থাকলে নাগরিকত্বের জন্য অপেক্ষার সময় আরও বাড়বে।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, কেউ যদি গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত হন, তবে নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ আরও দীর্ঘ হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, চার বছরের কারাদণ্ড ভোগ করা কোনো ব্যক্তিকে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে ১৫ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, নাগরিকত্ব যেন একটি অর্জন, কেবলমাত্র বসবাসের স্বাভাবিক ফল না হয়, এটাই তাদের লক্ষ্য।
অভিবাসনমন্ত্রী ইয়োহান ফোরসেল বলেন, বর্তমান ব্যবস্থায় নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে কার্যত কোনো বাস্তব শর্ত নেই। আমরা চাই, নাগরিকত্ব পাওয়ার আগে কেউ সুইডিশ সমাজ সম্পর্কে মৌলিক ধারণা রাখুক। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কেউ যদি নাগরিক হতে চান, তবে সুইডেন রাজতন্ত্র না প্রজাতন্ত্র, এ ধরনের মৌলিক বিষয় জানা যুক্তিসঙ্গত।
বিশ্লেষকদের মতে, এই কঠোর অবস্থানের শিকড় ২০১৫ সালের শরণার্থী সংকটে। সে বছর সিরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার আশ্রয়প্রার্থী সুইডেনে আশ্রয় চান। ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় উদার নীতির কারণে সুইডেন তখন অন্যতম প্রধান গন্তব্যে পরিণত হয়। এরপর থেকেই ধাপে ধাপে আশ্রয়, স্থায়ী বসবাস ও নাগরিকত্ব নীতিতে কঠোরতা আরোপ করে আসছে দেশটি। বর্তমান ডানপন্থী জোট সরকার সেই ধারাকেই আরও জোরালোভাবে এগিয়ে নিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসন ইস্যুতে কঠোর অবস্থান আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য পার্লামেন্ট নির্বাচনে সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অভিবাসন, আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক সংহতি, এই তিনটি বিষয় বর্তমানে সুইডিশ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। সরকার মনে করছে, নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত আরোপ করলে ভোটারদের একটি বড় অংশের সমর্থন আদায় করা সম্ভব হবে, বিশেষ করে যারা অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন।
অন্যদিকে, মানবাধিকার সংগঠন ও অভিবাসী অধিকারকর্মীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, নতুন নিয়মের ফলে অনেক দীর্ঘদিন বসবাসকারী অভিবাসীও নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। বিশেষ করে আয়ের ন্যূনতম শর্ত নিম্নআয়ের পেশাজীবীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে তাদের মত।
সরকার জানিয়েছে, প্রস্তাবিত নতুন নিয়মগুলো আগামী ৬ জুন থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত বাস্তবায়নের আগে সংসদীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।


