আমেরিকার দীর্ঘ ধূসর মহাসড়কগুলোতে এখন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে শান্তির মন্ত্র। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থের ‘হুওং দাও ভিপাসনা ভাবনা সেন্টার’ থেকে শুরু হয়েছে এক ঐতিহাসিক মহাযাত্রা, ‘ওয়াক ফর পিস’। ১০টি অঙ্গরাজ্য পেরিয়ে ২ হাজার ৩০০ মাইল দূরের ওয়াশিংটন ডি.সি.-তে পৌঁছানোই এই যাত্রার লক্ষ্য। কিন্তু এই ১৯ জন বৌদ্ধ ভিক্ষুর আধ্যাত্মিক মিছিলে সবার নজর কেড়ে নিয়েছে একটি বিশেষ সদস্য উদ্ধারকৃত কুকুর ‘আলোকা’।
আলোকা: অন্ধকারের শান্তির দূত
পালি ভাষায় ‘আলোকা’ শব্দের অর্থ হলো ‘আলো’। এই নামটির সার্থকতা মিশে আছে কুকুরটির জীবনের গল্পে। একসময় পরিত্যক্ত এবং অবহেলিত এই কুকুরটিকে উদ্ধার করেছিলেন ভিক্ষুরা। আজ সেই আলোকা কেবল একজন সঙ্গী নয়, বরং এই শান্তি যাত্রার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। গৈরিক বসনধারী ভিক্ষুদের সাথে তাল মিলিয়ে প্রতিদিন মাইলের পর মাইল হাঁটছে আলোকা। তার ধীরস্থির চলন আর শান্ত স্বভাব পথে দেখা হওয়া হাজারো মানুষের হৃদয় জয় করে নিয়েছে। ভিক্ষুরা যখন ধ্যানে মগ্ন থাকেন, আলোকা তখন নিঃশব্দে পাশে বসে থাকে। প্রতিকূল আবহাওয়া বা দীর্ঘ পথের ক্লান্তি, কোনো কিছুই তাকে দমাতে পারেনি। সে যেন এক জীবন্ত প্রতীক যে, শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা কেবল মানুষের জন্য নয়, বরং জগতের সকল প্রাণীর জন্য।
রক্তভেজা পথে ক্ষমার মহিমা
এই দীর্ঘ যাত্রা সবসময় মসৃণ ছিল না। গত ১৯ নভেম্বর টেক্সাসের ডেটন শহরের কাছে হাইওয়ে ৯০-এ এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়েন তারা। একটি দ্রুতগামী পিকআপ ট্রাকের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন শ্রদ্ধেয় ভিক্ষু মহা দাম ফোম্মাসান। পরিস্থিতি এতটাই জটিল ছিল যে, চিকিৎসকদের তার একটি পা কেটে ফেলতে হয়।
কিন্তু হাসপাতালের বিছানায় শুয়েও ভান্তে দাম ফোম্মাসান যে বার্তা দিয়েছেন, তা বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছে। তিনি বলেছিলেন, শান্তি ও করুণার বার্তা ছড়িয়ে দিতে যদি আমার একটি পা বিসর্জন দিতে হয়, তবে আমি তা সানন্দে গ্রহণ করি। আমি চালকের প্রতি কোনো ক্ষোভ পোষণ করি না, বরং তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। এই অভাবনীয় ক্ষমা এবং ত্যাগের গল্প ছড়িয়ে পড়ার পর যাত্রার গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। যে চালক দুর্ঘটনা ঘটিয়েছিলেন, তার প্রতি ভিক্ষুদের এই করুণা মানুষের মনে গভীর রেখাপাত করেছে।
পুলিশ ও সাধারণ মানুষ
দুর্ঘটনার পর দৃশ্যপট বদলে যায়। বর্তমানে এই শান্তি পদযাত্রাকে নিরাপত্তা দিতে বিভিন্ন শহরের পুলিশ বিভাগ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসছে। অনেক পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখা গেছে ভিক্ষুদের হাতে তাদের অফিশিয়াল ব্যাজ ও পিন তুলে দিতে। শ্রদ্ধেয় ভিক্ষু পান্নাকারা পরম মমতায় সেই পিনগুলো তাঁর রোবে ধারণ করেছেন। এটি এখন কেবল বৌদ্ধদের যাত্রা নয়, বরং আমেরিকান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাধারণ মানুষের এক যৌথ মানবিক মিশনে পরিণত হয়েছে।
জীবনশৈলী ও আধ্যাত্মিকতা
১২০ দিনের এই পিলগ্রিমেজ বা তীর্থযাত্রায় ভিক্ষুরা, দিনে মাত্র একবার খাবার গ্রহণ, অধিকাংশ সময় খোলা আকাশের নিচে বা সাধারণ তাবু পেতে রাত্রিযাপন এবং পথে পথে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাথে সাক্ষাৎ, ধ্যানে প্রশিক্ষণ এবং অহিংসার শিক্ষা প্রচারসহসপ্রাচীন ও কঠোর নিয়মগুলো মেনে চলছেন।
গন্তব্য ও বিশ্বশান্তি
বর্তমানে ভিক্ষু মহা দাম হাসপাতাল থেকে ফিরে জর্জিয়ার স্নেলভিলে মন্দিরে দলের সাথে পুনরায় মিলিত হয়েছেন। তিনি সশরীরে হাঁটতে না পারলেও হুইলচেয়ারে বসে বা অন্তরের শক্তি দিয়ে দলের সাথে যুক্ত আছেন। আর সাথে আছে সেই বিশ্বস্ত সঙ্গী ‘আলোকা’। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ওয়াশিংটন ডি.সি.-তে পৌঁছানোর মাধ্যমে এই পদযাত্রা শেষ হবে। সেখানে একটি বিশাল শান্তি সমাবেশের পরিকল্পনা করা হয়েছে। আলোকা, ভান্তে দাম ফোম্মাসান এবং বাকি ভিক্ষুরা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন, পা হারানো বা শারীরিক কষ্ট বড় কথা নয়, মনের ভেতরের শান্তি ও ক্ষমা দিয়ে পৃথিবীকে জয় করাই আসল সার্থকতা।
“জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক, দুঃখ হতে মুক্তি লাভ করুক।”


