ইউরোপের দক্ষিণাঞ্চলীয় দেশ গ্রিসে অভিবাসী মুসলিমদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। সরকার অনুমোদনহীন উপাসনালয় নিয়ন্ত্রণে কঠোর অভিযান শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে এক বাংলাদেশি ইমামের বসবাসের অনুমতি বাতিল করে তাকে দেশত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং দেশজুড়ে প্রায় ৬০টি মসজিদ বন্ধের ঘোষণা এসেছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের দাবি, এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে রমজান ও জুমার নামাজ আদায় মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
গ্রিসের রাজধানী এথেন্স-এর অ্যাজিওস নিকোলাওস এলাকায় একটি বেজমেন্টে পরিচালিত নামাজের স্থানে পুলিশের অভিযান চালানো হয়। অভিযোগ তোলা হয়, স্থানটি সরকার অনুমোদিত নয়, বিদেশি নাগরিক ইমামতি করছিলেন এবং নিরাপত্তা ও নিবন্ধন আইন মানা হয়নি। অভিযানের পর মসজিদটি সিলগালা করে দেওয়া, সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি ইমামের রেসিডেন্স পারমিট বাতিল ও তাকে বহিষ্কারের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। স্থানীয় সূত্র জানায়, এটি ছিল মূলত শ্রমজীবী বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় মুসলমানদের ব্যবহৃত নামাজঘর।
গ্রিসের অভিবাসন ও আশ্রয়নবিষয়ক মন্ত্রী থানোস প্লেভরিস সংসদীয় কমিটিতে জানান, নতুন আইন ৫২২৪/২০২৫ অনুযায়ী অনুমোদনহীন ধর্মীয় স্থাপনা পরিচালনা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সরকারের যুক্তি হলো নিরাপত্তা ঝুঁকি প্রতিরোধ, অনিবন্ধিত ধর্মীয় নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ, বিদেশি অর্থায়ন ও চরমপন্থা নজরদারি এবং রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে ধর্মীয় কার্যক্রম নিশ্চিত করা। মন্ত্রী বলেন, দেশে অনুমোদিত কাঠামোর বাইরে কোনো উপাসনালয় চলবে না।
সরকারি তালিকায় যেসব স্থান বন্ধের আওতায় সেগুলো হলো, বেজমেন্ট মসজিদ, ভাড়া ফ্ল্যাটে নামাজঘর ও রেজ বা দোকানঘরে স্থাপিত উপাসনালয়।প্রাথমিক তথ্যে জানা যায়, মোট প্রায় ৬০টি মসজিদ বন্ধ করা হয়, এর মধ্যে ২০-২৫টি বাংলাদেশিদের পরিচালিত, বাকিগুলো পাকিস্তান, মিশর ও আরব অভিবাসীদের।
এথেন্সে সরকার অনুমোদিত একটি মাত্র বড় মসজিদ রয়েছে, ভোটানিকস এলাকায় অবস্থিত রাষ্ট্রীয় মসজিদ। সমস্যা হলো, সেটি অভিবাসী শ্রমিকদের বাসস্থান থেকে দূরে। রাতের শিফট কর্মীদের জন্য যাওয়া কঠিন এবং দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ প্রায় অসম্ভব। ফলে গত এক দশকে ছোট ছোট কমিউনিটি মসজিদ গড়ে ওঠে।
গ্রিসে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটি জরুরি সভা করেছে। তাদের দাবি, ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে, অন্তত রমজান পর্যন্ত সময় দিতে হবে। এছাড়া কমিউনিটি মসজিদ নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়ার দাবিও করেন তারা। এক কমিউনিটি নেতা বলেন, আমরা অবৈধ কিছু করতে চাই না, শুধু নামাজ পড়ার জায়গা চাই।
রমজানে পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। সম্ভাব্য প্রভাব হিসেবে, তারাবি নামাজ সীমিত হবে, ঈদের জামাত আয়োজন কঠিন ও কর্মজীবী মুসলিমদের ধর্মীয় চর্চা কমে যাবে।বাংলাদেশ দূতাবাস বিষয়টি কূটনৈতিকভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। প্রাথমিকভাবে তারা আইনগত ব্যাখ্যা চাইছে, বহিষ্কার প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করছে এবং কমিউনিটির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে।
বিশ্লেষকদের মতে এটি কেবল গ্রিসের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত নয়, ইউরোপে অভিবাসন ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণের বৃহত্তর নীতির অংশ। ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশে, বিদেশি ইমাম নিয়োগে বাধা, ধর্মীয় অর্থায়নে নজরদারি অনিবন্ধিত উপাসনালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এটি ধর্মীয় স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা, শ্রমজীবী মুসলিমদের বাস্তবতা বিবেচনা করা হয়নি। সরকার বলছে, এটি নিরাপত্তা ও আইনের প্রয়োগ মাত্র।
বিশেষজ্ঞরা তিনটি সমাধান দেখছেন, সেগুলো হলো কমিউনিটি মসজিদ নিবন্ধন, সরকারি মসজিদের সংখ্যা বাড়ানো এবং বিদেশি ইমামদের অস্থায়ী লাইসেন্স।
গ্রিসের নতুন পদক্ষেপ অভিবাসী মুসলিমদের ধর্মীয় জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করতে যাচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশি শ্রমজীবী প্রবাসীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হলে বিষয়টি কূটনৈতিক ও মানবাধিকার ইস্যুতে রূপ নিতে পারে এমন আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।


