বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর জোরালো আহ্বানের এক বছর অতিক্রম করার পরও পোল্যান্ড, রোমানিয়া বা ফিনল্যান্ডের মতো দেশগুলোর নতুন কোনো ভিসা কার্যক্রম ঢাকায় শুরু হয়নি। ফলে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য ইউরোপমুখী হাজার হাজার বাংলাদেশি এখনও দিল্লি-নির্ভর জটিলতায় আটকা পড়ে আছেন। বর্তমানে ইউরোপের অনেক দেশের জন্য বাংলাদেশিদের এখনও ভারতের দিল্লির ওপর নির্ভর করতে হয়। সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ভারতীয় ভিসা প্রাপ্তি কঠিন হয়ে পড়ায় এবং দিল্লি যাতায়াত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ হওয়ায় এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, একটি নতুন দেশে পূর্ণাঙ্গ ভিসা সেন্টার বা কনস্যুলার সেবা চালু করা বেশ ব্যয়বহুল। অনেক ইউরোপীয় দেশ মনে করছে, বর্তমান অবকাঠামোতে বাংলাদেশে সরাসরি অফিস খোলার চেয়ে দিল্লি কেন্দ্রিক কার্যক্রম চালানো তাদের জন্য অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী। ইউরোপীয় দেশগুলো ভিসা প্রদানের আগে আবেদনকারীর নথিপত্র এবং ব্যক্তিগত তথ্যের কঠোর যাচাইকরণ করে। অনেক দেশের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, বাংলাদেশে তাদের পর্যাপ্ত জনবল ও উন্নত নিরাপত্তা পরিকাঠামো না থাকায় তারা এখনই ঢাকায় কার্যক্রম শুরু করতে দ্বিধাগ্রস্ত।
দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক হাব হিসেবে দিল্লি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ইউরোপীয় অনেক দেশ তাদের দক্ষিণ এশীয় কার্যক্রম ভারতের মাধ্যমে পরিচালনা করতে অভ্যস্ত। এই দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে হঠাৎ ঢাকায় নতুন সেটআপ তৈরি করতে প্রশাসনিক ও নীতিগত জটিলতা দেখা দিচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মেধাবী শিক্ষার্থীরা। ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অফার লেটার পেয়েও শুধুমাত্র দিল্লির অ্যাপয়েন্টমেন্ট না পাওয়ায় বা ভারতীয় ভিসা না মেলায় শত শত শিক্ষার্থীর শিক্ষাবর্ষ নষ্ট হচ্ছে।
সম্প্রতি ফ্রান্সের নতুন ভিএফএস সেন্টার চালু হওয়ার খবর কিছু আশার সঞ্চার করেছে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকার ইইউ-এর সাথে ‘সিঙ্গেল ভিসা পয়েন্ট’ বা একটি সমন্বিত কেন্দ্রের মাধ্যমে একাধিক দেশের ভিসা প্রসেসিংয়ের প্রস্তাবও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে।
এরআগে ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশিদের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোর ভিসা সেন্টার ভারত থেকে সরিয়ে ঢাকায় অথবা পার্শ্ববর্তী কোনো দেশে স্থানান্তরের জোরালো আহ্বান জানিয়েছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)-এর ১৯ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এই প্রস্তাব দেন। বৈঠকে প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউর রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার।
ড. ইউনূস উল্লেখ করেছিলেন যে, বর্তমানে ভারত থেকে বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা সুবিধা সীমিত থাকায় হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও পেশাজীবী চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। ইউরোপের অনেক দেশের দূতাবাস বাংলাদেশে নেই, যার ফলে ভিসা পেতে শিক্ষার্থীদের দিল্লি যেতে হয়। কিন্তু ভারত থেকে ভিসা পাওয়ার জটিলতার কারণে অনেক শিক্ষার্থী সময়মতো ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যোগ দিতে পারছেন না। এতে তাদের শিক্ষাজীবন ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে।
বৈঠকে ড. ইউনূস আরও বলেছিলেন, ভারত বাংলাদেশিদের ভিসা সীমিত করায় অনেক শিক্ষার্থী ইউরোপের ভিসা নিতে দিল্লি যেতে পারছেন না। এর ফলে ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও প্রতিভাবান বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই কেন্দ্রগুলো ঢাকায় সরিয়ে আনলে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন, উভয় পক্ষই লাভবান হবে।
বৈঠকে বুলগেরিয়ার উদাহরণ তুলে ধরে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনও জানিয়েছেন যে, ইতোমধ্যে বুলগেরিয়া তাদের ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করতে বাংলাদেশিদের জন্য ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনাম থেকে আবেদনের সুযোগ তৈরি করেছে। তিনি অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোকেও এই মডেল অনুসরণ করার বা সরাসরি ঢাকায় ভিসা কার্যক্রম পরিচালনার আহ্বান জানান।
গত বছরের এই বৈঠকে ইইউ প্রতিনিধিরাও বাংলাদেশের সংস্কার প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তারা শ্রম অধিকার, বাণিজ্য সুবিধা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানবাধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাংলাদেশের সাথে কাজ করার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেছিলেন।
এদিকে, বর্তমানে অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী যারা জার্মানি, ফ্রান্স বা ইতালির মতো দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন, তারা দিল্লির অ্যাপয়েন্টমেন্ট না পেয়ে হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। সরকারের এই নতুন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা যদি সফল হয়, তবে, ভিসা প্রসেসিংয়ের সময় ও খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এছাড়া শিক্ষার্থী ও কর্মীদের তৃতীয় কোনো দেশে যাওয়ার ঝামেলা থাকবে না এবং ইউরোপের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের প্রবেশ আরও সহজ হবে।
তাই, শুধুমাত্র আশ্বাস নয়, বরং দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশের জনশক্তি ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ ইউরোপের বাজার হারাবে। সরকারের উচিত ইইউ-এর দেশগুলোকে ঢাকায় সেন্টার খোলার জন্য বিশেষ সুবিধা বা কর ছাড়ের মতো প্রস্তাব দেওয়া।


