যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড-সংক্রান্ত আগ্রাসী বক্তব্যকে ঘিরে ইউরোপজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লেও, ফ্রান্স সরকার আপাতত খেলাধুলাকে রাজনীতির বাইরে রাখার নীতিতেই অনড় রয়েছে। ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ বয়কটের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন ফ্রান্সের ক্রীড়ামন্ত্রী মারিনা ফেরারি।
গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার হুমকি দেওয়ার পর ইউরোপের একাধিক দেশ ট্রাম্পের বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে। গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হওয়ায় বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইন ও ইউরোপীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। এর জেরে ফ্রান্সসহ আটটি ইউরোপীয় দেশের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকিও দেন ট্রাম্প। এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ২০২৬ বিশ্বকাপ, যার অন্যতম আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র।
ফ্রান্সের বামপন্থি রাজনীতিবিদ এবং সংসদের অর্থবিষয়ক কমিটির প্রধান এরিক কোকরেল এ বিষয়ে সবচেয়ে কড়া অবস্থান নেন। তিনি বলেন, যে দেশ প্রতিবেশী ভূখণ্ড দখলের হুমকি দেয় এবং আন্তর্জাতিক আইনকে প্রকাশ্যে উপেক্ষা করে, সেই দেশে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলার কথা কল্পনাও করা যায় না। তার মতে, এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব প্রত্যাহার করা উচিত।
তবে কোকরেলের এই বক্তব্যের জবাবে ফ্রান্স সরকার সংযত সুরে কথা বলেছে। ক্রীড়ামন্ত্রী মারিনা ফেরারি স্পষ্ট করে জানান, এই মুহূর্তে বিশ্বকাপ বয়কট করার কোনো ইচ্ছা বা পরিকল্পনা সরকারের নেই। তিনি স্বীকার করেন, রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্নমত রয়েছে, তবে তার মতে খেলাধুলাকে রাজনৈতিক সংঘাতের বাইরে রাখাই সবচেয়ে যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত। ফ্রান্স সরকার বিশ্বকাপকে একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া উৎসব হিসেবেই দেখতে চায়।
রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি ক্রীড়াঙ্গন থেকেও ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে। ফরাসি কোচ ক্লদ লে রয় ফরাসি দৈনিক ফিগারোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের আফ্রিকা মহাদেশের প্রতি আচরণ এবং বক্তব্য বিবেচনায় নিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ বয়কট করা উচিত কি না, সে প্রশ্ন তোলা অযৌক্তিক নয়। তার মন্তব্য নতুন করে বিতর্কে ঘি ঢালে।
ফ্রান্সের অবস্থান ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগেই জার্মানি বিষয়টি থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়। জার্মানির ক্রীড়া বিষয়ক রাষ্ট্রীয় মন্ত্রী ক্রিশ্চিয়ানে শেন্ডারলাইন বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানান, বড় ক্রীড়া আসরে অংশ নেওয়া বা বয়কট করার সিদ্ধান্ত রাজনীতিকদের নেওয়ার বিষয় নয়। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার একমাত্র অধিকার সংশ্লিষ্ট ক্রীড়া সংস্থা ও ফেডারেশনগুলোর। এই বক্তব্য ইউরোপে খেলাধুলা ও রাজনীতির সীমারেখা নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও স্পষ্ট করে।
এই পুরো বিতর্কে ফিফার ভূমিকাও আলোচনায় এসেছে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে আগে থেকেই সমালোচনা রয়েছে। সেই সমালোচনা আরও জোরালো হয় গত ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ড্র অনুষ্ঠানে, যেখানে ইনফান্তিনো একটি বিশেষ ‘ফিফা পিস প্রাইজ’ চালু করে ট্রাম্পের হাতে তুলে দেন। সমালোচকদের মতে, এতে ফিফার নিরপেক্ষতা ও নৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে আবারও সামনে এসেছে খেলাধুলা ও রাজনীতির সম্পর্কের প্রশ্ন। একদিকে রয়েছে আন্তর্জাতিক আইন, ভূরাজনৈতিক হুমকি ও নৈতিক অবস্থানের দাবি। অন্যদিকে রয়েছে খেলাধুলাকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। ফ্রান্স সরকার আপাতত স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা এই বিশ্বকাপকে রাজনৈতিক সংঘাতের মঞ্চ নয়, বরং একটি বৈশ্বিক ক্রীড়া উৎসব হিসেবেই দেখতে চায়।


