ইতালির কারা ব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি কারাগারে বন্দীদের জন্য চালু করা হয়েছে তথাকথিত ‘সেক্স রুম’, যেখানে নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণকারী বন্দীরা তাঁদের সঙ্গীর সঙ্গে সীমিত সময়ের জন্য ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ করতে পারবেন।
এই উদ্যোগকে বন্দীদের ‘ঘনিষ্ঠ সাক্ষাতের অধিকার’ স্বীকৃতির পথে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি ইতালির কারা নীতিতে মানবাধিকারভিত্তিক সংস্কারের ইঙ্গিতও দিচ্ছে।
এই বিশেষ কক্ষ মূলত সেই বন্দীদের জন্য নির্ধারিত, যাদের সঙ্গী কারাগারে এসে সাক্ষাৎ করতে পারেন এবং যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে বৈধ বা স্থায়ী সম্পর্কে রয়েছেন, এই ‘সেক্সরুম’ তাদের জন্য। কক্ষে রয়েছে, একটি সাধারণ বিছানা, একটি টয়লেট ও ন্যূনতম ব্যক্তিগত পরিসর।
এটি কোনো বিলাসবহুল হোটেল কক্ষ নয়, তবে কর্তৃপক্ষের ভাষায়, “মানবিক মর্যাদা রক্ষার জন্য যথেষ্ট”।
অনুমোদনপ্রাপ্ত বন্দীরা সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা পর্যন্ত এই কক্ষ ব্যবহার করতে পারবেন। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে কক্ষে বাইরে থেকে তালা দেওয়ার অনুমতি নেই, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে কারারক্ষীরা দ্রুত হস্তক্ষেপ করতে পারেন।
ইতালির উমব্রিয়া অঞ্চলে শুক্রবার প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলকভাবে এই কক্ষ ব্যবহার করা হয়। এক বন্দীকে তাঁর সঙ্গীর সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেখানে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। উমব্রিয়ার বন্দী অধিকারবিষয়ক ওমবাডসম্যান জিউসেপ্পে কাফোরিও সংবাদ সংস্থা এএনএসএ-কে বলেন,
“আমরা বলতে পারি এই পরীক্ষা সফল হয়েছে, সবকিছু শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নে হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সুরক্ষার জন্য সর্বোচ্চ গোপনীয়তা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।”
তিনি জানান, আগামী দিনগুলোতে আরও কয়েকটি এমন সাক্ষাৎ আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। একসময় ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশে কারাগারে দাম্পত্য সাক্ষাৎ ছিল স্বাভাবিক প্রথা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ, কারাগারের অতিরিক্ত ভিড় এবং বাজেট ও জনবল সংকট, এসব কারণে অনেক দেশেই এই ব্যবস্থা সীমিত বা বাতিল হয়ে যায়।
তবে এখনো ইউরোপের কয়েকটি দেশে সীমিত আকারে এই সুবিধা চালু রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, সুইডেন ও নেদার্ল্যান্ডস। সর্বশেষ সেই তালিকায় যুক্ত হলো ইতালি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি রয়েছে, দীর্ঘদিন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা বন্দীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সম্পর্ক বজায় থাকলে পুনর্বাসনের সম্ভাবনাও বাড়ে। দাম্পত্য বা দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক টিকে থাকলে মুক্তির পর সমাজে ফিরে যাওয়ার পথ তুলনামূলক সহজ হয়। এছাড়া ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের বিভিন্ন রায়ে বন্দীদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে, এই উদ্যোগ তারই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এই সুবিধা সবার জন্য নয়। ধারণা করা হচ্ছে, শুধু বিবাহিত বা দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে থাকা বন্দীরাই যোগ্য হবেন, আগেই প্রশাসনিকভাবে যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হতে হবে এবং গুরুতর অপরাধ বা নিরাপত্তা ঝুঁকির ক্ষেত্রে অনুমতি নাও মিলতে পারে। তবে ঠিক কোন কোন শর্ত পূরণ করলে এই সুবিধা পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে এখনো সরকারিভাবে বিস্তারিত নির্দেশনা প্রকাশ হয়নি।
এই উদ্যোগকে ঘিরে ইতালিতে বিতর্কও শুরু হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এটি নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, সাধারণ নাগরিকদের চোখে অপরাধীদের প্রতি অতিরিক্ত ছাড় হিসেবে দেখা হতে পারে।
অন্যদিকে মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন,
“কারাগার শাস্তির জায়গা, প্রতিশোধের নয় মানবিক আচরণ অপরাধ দমনে সহায়ক।”
সব মিলিয়ে, ইতালির এই ‘সেক্স রুম’ শুধু একটি কক্ষ নয়, এটি কারা ব্যবস্থায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের প্রতীক। এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে ইতালির অন্যান্য কারাগারেও বিস্তৃত হবে কি না, তা এখন দেখার বিষয়।


