ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপে অনিয়মিত অভিবাসন ও মানবপাচার ঠেকাতে ইতালি ও লিবিয়ার মধ্যে ২০১৭ সালে স্বাক্ষরিত ‘ইতালি–লিবিয়া মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ (এমওইউ) আরও তিন বছরের জন্য নবায়ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে লিবীয় কোস্ট গার্ডের হাতে ১০টি আধুনিক টহল জাহাজ হস্তান্তর করেছে ইতালি।
ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন হওয়া এই চুক্তি এখন ২০২৯ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। সরকারের দাবি, ভূমধ্যসাগরপথে অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন ঠেকানো, মানবপাচারকারীদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং সমুদ্রে মৃত্যুর সংখ্যা কমানোর লক্ষ্যেই এই চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে।
চুক্তিতে যা আছে
চুক্তি অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগরের মধ্য ও দক্ষিণ অংশে নজরদারির দায়িত্বে থাকবে লিবীয় কোস্ট গার্ড। ইউরোপের উদ্দেশ্যে যাত্রারত অনিয়মিত অভিবাসীবাহী নৌকা শনাক্ত ও আটক করে সেগুলোকে ইতালিতে না এনে সরাসরি লিবিয়ায় ফিরিয়ে নেওয়া হবে। আটক অভিবাসীদের লিবিয়ার ডিটেনশন সেন্টারে স্থানান্তর করা হবে। ইতালি সরকারের ভাষ্য, এতে করে ইউরোপীয় উপকূলে অভিবাসীদের ভিড় কমবে এবং দালালচক্রের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে।
১০টি আধুনিক টহল জাহাজ
হস্তান্তর করা ১০টি নতুন টহল জাহাজ উচ্চগতিসম্পন্ন এবং আধুনিক রাডার ও নজরদারি প্রযুক্তিতে সজ্জিত। এসব জাহাজ দূর থেকে ছোট কাঠের নৌকা বা রাবারের বোট শনাক্ত করতে সক্ষম। ইতালির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, নতুন জাহাজগুলো মোতায়েনের ফলে লিবীয় কোস্ট গার্ডের নজরদারি সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। ইতালি সরকারের দাবি, এই জাহাজগুলোর মাধ্যমে সমুদ্রপথে অবৈধভাবে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করলে ধরা পড়ার ঝুঁকি ৯০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পাবে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগ
চুক্তি নবায়নের ঘোষণার পরপরই মানবাধিকার সংস্থাগুলো তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং একাধিক ইউরোপীয় মানবাধিকার সংগঠনের মতে, লিবিয়ায় ফেরত পাঠানো অভিবাসীরা সেখানে অমানবিক আচরণ, নির্যাতন, জোরপূর্বক শ্রম, যৌন সহিংসতা ও চরম অবমাননাকর পরিবেশের মুখোমুখি হন। তাদের অভিযোগ, লিবিয়ার ডিটেনশন সেন্টারগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড পূরণ করে না। অনেক ক্ষেত্রে অভিবাসীদের দীর্ঘ সময় আটকে রাখা হয়, পর্যাপ্ত খাবার, চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা পাওয়া যায় না। এক বিবৃতিতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, এই চুক্তি কার্যত অভিবাসীদের এমন একটি দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করছে, যেখানে তাদের মৌলিক মানবাধিকার সুরক্ষিত নয়।
ইতালি সরকারের অবস্থান
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সমালোচনার জবাবে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার বলছে, এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য মানবিক। সরকারের দাবি, অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনের ফলে সমুদ্রে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে, যা বন্ধ করতে দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। ইতালি সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়, মানবপাচারকারীদের ব্যবসা বন্ধ না করলে ভূমধ্যসাগর অভিবাসীদের জন্য একটি গণকবরেই পরিণত হবে। সরকার আরও জানায়, লিবীয় কোস্ট গার্ডকে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি ডিটেনশন সেন্টারগুলোর পরিস্থিতি উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
অভিবাসীদের প্রতি সতর্কবার্তা
চুক্তি নবায়নের প্রেক্ষিতে ইতালি সরকার আবারও দালালের মাধ্যমে সমুদ্রপথে ইউরোপে পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা না করার আহ্বান জানিয়েছে। সরকারি সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী হতে পারে। সরকারের মতে, বৈধ ভিসা ও আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করলে ধরা পড়ার ঝুঁকি যেমন বাড়বে, তেমনি লিবিয়ায় ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনাও বেশি থাকবে।
ইউরোপীয় প্রেক্ষাপট
বিশ্লেষকদের মতে, ইতালি–লিবিয়া চুক্তি নবায়ন ইউরোপজুড়ে কঠোর অভিবাসন নীতিরই প্রতিফলন। ইতালি ছাড়াও গ্রিস, স্পেন ও ফ্রান্স ভূমধ্যসাগর পথে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে আরও কড়া অবস্থান নিচ্ছে। তবে মানবাধিকার বনাম সীমান্ত নিরাপত্তা, এই দ্বন্দ্ব ইউরোপীয় রাজনীতিতে আরও গভীর হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


