ইতালিতে বসবাসরত বাংলাদেশি মুসলিমদের দীর্ঘদিনের মানবিক ও ধর্মীয় দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রোম পৌরসভা মুসলিম কবরস্থানের স্থান সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফ্ল্যামিনিও ও প্রিমা পর্তা কবরস্থানে মুসলিমদের জন্য নির্ধারিত অংশ বাড়িয়ে প্রায় ৪০০টি নতুন কবরের স্থান যুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। রোমে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ ও ধারাবাহিক কূটনৈতিক তৎপরতার ফলেই এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথে এগিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
রোম মহানগরীতে আনুমানিক এক লাখ মুসলিমের বসবাস রয়েছে, যার একটি বড় অংশ বাংলাদেশি। বহু বাংলাদেশি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে ইতালিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন, অনেকেই ইতালির নাগরিকত্বও পেয়েছেন। তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় মুসলিম কবরস্থানের পরিসর সীমিত থাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দাফন নিয়ে উদ্বেগ ও সংকট দেখা দেয়। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় রোমের কবরস্থানগুলোতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। এতে দাফনে বিলম্ব, স্থান সংকট এবং কিছু ক্ষেত্রে মরদেহ নিজ দেশে পাঠানোর মতো জটিল পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয় প্রবাসী পরিবারগুলোকে।
এই বাস্তবতায় রোমে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে রোম পৌর কর্তৃপক্ষের নজরে আনে। ইতালিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত রকিবুল হক-এর নেতৃত্বে দূতাবাসের প্রতিনিধিদল প্রিমা পর্তা কবরস্থান সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে মুসলিমদের জন্য ইতোমধ্যে নির্ধারিত অংশের পাশেই নতুন একটি স্থান চিহ্নিত করা হয়, যেখানে পরিকল্পিতভাবে প্রায় ৪০০টি নতুন সমাধি স্থাপন করা সম্ভব হবে। পরবর্তীতে বিষয়টি রোম পৌরসভার সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও পরিবেশ বিভাগে উত্থাপন করা হলে তারা নীতিগতভাবে সম্মতি দেয়। রোমের পরিবেশ কাউন্সিলর সাবরিনা আলফোনসি বলেন,
“রাজধানী রোম একটি বহুসংস্কৃতি ও বহুধর্মীয় সহাবস্থানের শহর। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় চাহিদাকে সম্মান জানানো একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর ব্যবস্থার অংশ। পার্থক্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমেই শহর আরও মানবিক ও সমন্বিত হয়ে ওঠে।”
তিনি জানান, কোভিড-পরবর্তী সময়ে কবরস্থান ব্যবস্থাপনায় যে চাপ ও সীমাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে পৌরসভা কবরস্থান ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের চাহিদাকে একটি সুনির্দিষ্ট প্রকল্পে রূপ দিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, এটি ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মুসলিম কবরস্থানের অভাব দীর্ঘদিন ধরেই একটি স্পর্শকাতর বিষয়। রোমের মতো ঐতিহাসিক শহরে মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য কবরস্থানের সম্প্রসারণ ধর্মীয় সহাবস্থানের বার্তা দিচ্ছে। নতুন এ ব্যবস্থার ফলে ইতালিতে বসবাসরত বাংলাদেশি মুসলিমরা এখন আরও নিশ্চিন্তভাবে স্থানীয়ভাবে ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী দাফনের সুযোগ পাবেন। এতে পরিবারগুলোকে মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর আর্থিক ও মানসিক চাপ থেকেও অনেকাংশে মুক্তি মিলবে।
ইতালি প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ এই উদ্যোগকে সময়োপযোগী ও মানবিক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তারা বলেছেন, দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথে এটি বড় অগ্রগতি। কমিউনিটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং রোম পৌর কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে। তাদের মতে, এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে ইতালির অন্যান্য শহরেও মুসলিম কবরস্থানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
রোম পৌরসভার এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে শুধু বাংলাদেশি নয়, বরং রোমে বসবাসরত অন্যান্য মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্যও দাফন সংকট অনেকটাই লাঘব হবে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, ইউরোপের অন্যান্য শহরও ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে সম্মান জানিয়ে এ ধরনের অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণ করবে।


