বিদেশে পড়াশোনা, উন্নত জীবনের আশায় চাকরি কিংবা ইউরোপ-আমেরিকার শহরগুলো ঘুরে দেখার স্বপ্ন, এই তিন আকাঙ্ক্ষাই বহু বাংলাদেশির জীবনের বড় লক্ষ্য। কিন্তু সাম্প্রতিক সেই স্বপ্নের পথে যেন অদৃশ্য অথচ কঠিন এক দেয়াল তুলে দেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের একাধিক দেশ, যুক্তরাষ্ট্র এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের অনেক গন্তব্যেও বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
স্টুডেন্ট ভিসা, ট্যুরিস্ট ভিসা কিংবা ওয়ার্ক ভিসা, সব ক্ষেত্রেই বাড়ছে প্রত্যাখ্যানের হার। কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও আবেদন বাতিল হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে জানানো হচ্ছে না সুনির্দিষ্ট কারণ। ফলে ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে বাড়ছে অনিশ্চয়তা, হতাশা এবং ক্ষোভ। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছেই, হঠাৎ কেন এই ভিসা সংকট? এর পেছনে কি শুধু বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর কঠোরতা দায়ী, নাকি দায় আছে আমাদের নিজেদেরও?
ভিসা প্রত্যাখ্যান
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউরোপে পড়াশোনার সুযোগ পেয়েও বহু বাংলাদেশি শেষ পর্যন্ত ভিসা না পাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অফার লেটার, আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ, ট্রাভেল হিস্ট্রি, সবকিছু ঠিক থাকার পরও আবেদন বাতিল হচ্ছে। অনেক আবেদনকারী বলছেন, ভিসা অফিস থেকে দেওয়া হচ্ছে অস্পষ্ট কারণ যেমন- অভিবাসন ঝুঁকি, অবস্থানের যৌক্তিকতা অপর্যাপ্ত ও দেশে ফিরে আসার ইচ্ছা স্পষ্ট নয়, এসব শব্দবন্ধ আবেদনকারীদের জন্য কার্যত ব্যাখ্যাহীন সিদ্ধান্তের মতোই। কারণ আপিলের সুযোগ সীমিত, আর নতুন করে আবেদন মানেই সময় ও বিপুল অর্থ ব্যয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা
একই চিত্র যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা ব্যবস্থাতেও। বহু আবেদনকারী বলছেন, দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও তারা স্টুডেন্ট বা ভিজিট ভিসা পাচ্ছেন না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের সময় শুরু হওয়া কঠোর অভিবাসন নীতির রেশ এখনো কাটেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভিসা বন্ড তালিকা ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের ধারণা। ফলে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে, দীর্ঘ ইন্টারভিউ, অতিরিক্ত ডকুমেন্ট এবং আর্থিক উৎসের গভীর যাচাই এখন নিয়মিত প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।
ইউরোপ যে কারণে বাংলাদেশিদের ‘হাই রিস্ক’ ভাবছে
অভিবাসন বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ রয়েছে।
ভুয়া কাগজপত্রের প্রবণতা
শিক্ষাগত সনদ, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, কাজের অভিজ্ঞতা কিংবা স্পনসর ডকুমেন্ট জাল করার প্রবণতা বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় কালো দাগ। ইউরোপীয় দূতাবাসগুলোর মতে,
“একটি দেশের কিছু আবেদনকারীর অনিয়ম
পুরো জাতিকেই অবিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।”
একবার কোনো দেশের নাগরিকরা জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত হিসেবে চিহ্নিত হলে, ভবিষ্যতের সব আবেদনই পড়ে যায় বাড়তি নজরদারির আওতায়।
ভিসা শর্ত ভেঙে অবৈধ অবস্থান
ট্যুরিস্ট ভিসায় গিয়ে কাজ করা, স্টুডেন্ট ভিসায় পড়াশোনা শেষ করে অবৈধভাবে থেকে যাওয়া কিংবা আশ্রয় আবেদন, এই ঘটনাগুলো ইউরোপের চোখে বাংলাদেশিদের অভিবাসন ঝুঁকি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অনেক ইউরোপীয় দেশে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন গ্রহণের হার খুবই কম। ফলে আবেদন বাতিল হলে তারা অবৈধ অবস্থায় পড়ে যান, যা ভবিষ্যতে নতুন আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তোলে।
আশ্রয় আবেদন ও ‘রিমেইন ট্রেন্ড’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু ইউরোপীয় দেশে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন বেড়েছে। যদিও অধিকাংশ আবেদনই শেষ পর্যন্ত বাতিল হচ্ছে, কিন্তু এই প্রবণতা ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের সতর্ক করে তুলেছে।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা
ভিসা নীতিতে এখন শুধু ব্যক্তিগত প্রোফাইল নয়, আবেদনকারীর দেশের সামগ্রিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া হয়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসনের অবস্থা, মানবাধিকার পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, এসব বিষয় বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে ভিসা কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। ফলে ব্যাকগ্রাউন্ড চেক, বায়োমেট্রিক যাচাই ও নিরাপত্তা স্ক্রিনিং আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় কঠোর হয়েছে।
শ্রমবাজারেও পিছিয়ে বাংলাদেশিরা
ভিসা সংকট শুধু ইউরোপ বা আমেরিকায় সীমাবদ্ধ নয়। শ্রমবাজারেও একই চিত্র। সৌদি আরব ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া সীমিত করেছে। জাপান ও সিঙ্গাপুরে দক্ষ কর্মীর সুযোগ থাকলেও সংখ্যা খুবই কম। এছাড়া ইউরোপে লিগ্যাল ওয়ার্ক ভিসার সুযোগ প্রায় বন্ধের পথে, ফলে বৈধ পথে কাজের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে, যা অবৈধ ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে।
ফেরত পাঠানোর পরিসংখ্যান
ব্র্যাক মাইগ্রেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, তিবছর গড়ে এক লাখ বাংলাদেশি বিভিন্ন দেশ থেকে ফেরত পাঠানো হয়। গত আট বছরে শুধু ইউরোপ থেকেই ফিরেছেন অন্তত চার হাজার বাংলাদেশি। এই পরিসংখ্যান ইউরোপের কাছে বাংলাদেশকে একটি হাই মাইগ্রেশন প্রেসার কান্ট্রি হিসেবে চিহ্নিত করছে।
দায় কার
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের দায় এককভাবে কারও নয়। ব্যক্তি পর্যায়ে ভুয়া কাগজপত্র ও নিয়ম ভাঙা, দালালচক্রের প্রতারণা ও অবৈধ পথে বিদেশ পাঠানোর ব্যবসা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুর্বল নজরদারি, সুশাসনের ঘাটতি ও সীমিত কূটনৈতিক সক্ষমতা, সব মিলিয়েই বাংলাদেশের পাসপোর্ট আজ আন্তর্জাতিকভাবে উচ্চ ঝুঁকির তালিকায়।
সমাধানের পথ
বিশ্লেষকদের মতে, ভিসা সংকট কাটাতে হলে, ভিসা জালিয়াতির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, দালালচক্র নির্মূলে কার্যকর অভিযান, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিতে রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ, বিদেশগমন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও ডিজিটাল নজরদারি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সুশাসন ও বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠন, এসবের কোনো বিকল্প নেই।
যতদিন বাংলাদেশ নিজেকে একটি বিশ্বাসযোগ্য অভিবাসন উৎস দেশ হিসেবে পুনর্গঠন করতে না পারবে, ততদিন বিদেশযাত্রার স্বপ্ন আটকে থাকবে ভিসা জটিলতার অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী দেয়ালে।


