ইতালির উত্তরাঞ্চলের মিলান, মোনজা, ব্রিয়ানজা ও লোদি অঞ্চলের চেম্বার অব কমার্স, অভিবাসীদের জন্য ‘ইন্টেগ্রা’ নামে একটি নতুন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করেছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে অভিবাসী, আশ্রয়প্রার্থী ও শরণার্থীদেরকে চাকরিমুখী প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা ইতালির শ্রমবাজারে সহজে প্রবেশ করতে পারেন।
এই কর্মসূচির অন্যতম পরিচালন সংস্থা ফর্মাপার জানিয়েছে, এক থেকে দুই মাসের সংক্ষিপ্ত ও নিবিড় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের পর সরাসরি কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। বিশেষ করে, যে সব খাতে কর্মী সংকট তীব্র যেমন নির্মাণ, হোটেল ও আতিথেয়তা, পোশাক প্রস্তুত, বাগান পরিচর্যা, লজিস্টিকস ও প্রযুক্তিগত সহায়তা, সেগুলোকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
প্রকল্পটি শুরু হয়েছে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এখন পর্যন্ত ২৫৮ জন অভিবাসী প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন এবং ১৩০ জন ইতিমধ্যেই চাকরিতে নিয়োগ পেয়েছেন।
বাংলাদেশিরাও অংশ নিচ্ছেন
ইন্টেগ্রা প্রকল্পে এখন পর্যন্ত ৩৮টি দেশের নাগরিক অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে পেরু, মিশর, ইউক্রেন, সাব-সাহারান আফ্রিকা, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানও রয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ নারী ও ৬০ শতাংশ পুরুষ।
বাংলাদেশিসহ এসব দেশের অংশগ্রহণকারীরা একমাসব্যাপী প্রশিক্ষণ শেষে স্থানীয় কোম্পানিগুলোতে চাকরির সুযোগ পাচ্ছেন। মিলানের একটি হোটেল, পোশাক কারখানা ও নির্মাণ সংস্থা ইতোমধ্যেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের কাজে নিয়োগ দিয়েছে।
ফর্মাপারের সিনিয়র প্রকল্প ব্যবস্থাপক এলেনা মারিনোত্তি বলেন…
অনেক অভিবাসী কাজ করতে চান, কিন্তু সুযোগ পান না। আমাদের এই কোর্সগুলো তাদের বাস্তব দক্ষতা ও চাকরির যোগ্যতা তৈরি করছে।
তিনি জানান, আটটি ব্যবসায়িক সংগঠন, চারটি বড় এনজিও এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় পুরো প্রকল্পটি পরিচালিত হচ্ছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের আইনি ও প্রশাসনিক সহায়তা দিচ্ছে শ্রমিক ইউনিয়নগুলো।
প্রশিক্ষণ শেষে চাকরির সুযোগ
মরক্কোর বুশরা লামদিহিনে ইন্টেগ্রার টেইলরিং কোর্স সম্পন্ন করে এখন মিলানের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করছেন। তিনি বলেন…
অনেক বছর পর আবার কাজের সুযোগ পেয়েছি। এখন আমি নিজের উপার্জনে গর্ববোধ করি।
একইভাবে, কঙ্গোর হেনক নাজোকু রাজমিস্ত্রির প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন টেইকোস নামের নির্মাণ কোম্পানিতে কর্মরত। তিনি বলেন…
আগে আমি সাধারণ শ্রমিক ছিলাম। এখন আমি পেশাদার মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করছি।
শ্রীলঙ্কার উথপালা ডি সিলভা আতিথেয়তা খাতে প্রশিক্ষণ নিয়ে মিলানের একটি গ্র্যান্ড হোটেলে কাজ করছেন। তিনি বলেন…
এটি আমার জীবনের নতুন অভিজ্ঞতা। আমি এখন আত্মনির্ভর।
কেন দরকার এমন প্রকল্প
ইতালির জনসংখ্যা দ্রুত বার্ধক্যের দিকে যাচ্ছে, আর শ্রমবাজারে কর্মী সংকট বাড়ছে। সরকারি সংস্থা আইস্ট্যাটের হিসেবে, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশটিতে সক্রিয় কর্মশক্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। ফলে নিয়মিত পথে আগত অভিবাসীদের ভূমিকা হয়ে উঠছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মিলান চেম্বার অব কমার্স জানিয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে ইতালিতে প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার নতুন কর্মীর প্রয়োজন হবে। এই প্রেক্ষাপটে ‘ইন্টেগ্রা’ প্রকল্পকে তারা ভবিষ্যতের একটি মডেল হিসেবে দেখছে।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা
২০২৬ সালে প্রকল্পটির পাইলট পর্ব শেষ হবে। এরপর এটি স্থায়ী আকারে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে ইতালির অন্যান্য শহরের চেম্বার অব কমার্সও আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
এলেনা মারিনোত্তির ভাষায়…
আমরা বিশ্বাস করি— যেখানে প্রশিক্ষণ আছে, সেখানেই ভবিষ্যত। অভিবাসীরা কেবল শ্রমশক্তিই নন, তারা দেশের অর্থনীতির অংশীদার।
তবে সবচাইতে ভালো খবরটি হল, এই প্রকল্পে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশিরা বেশ ভালো করেছেন। তাঁদের কল্যাণে আগামীতে যখন এই প্রকল্প আরো বর্ধিত আকারে চালু হবে তখন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি এই প্রশিক্ষন কর্মসূচীর সুফল ভোগ করবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।


