ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বিভিন্ন তহবিল ভবিষ্যতে কোন দেশকে কতটা প্রভাবিত করবে, এই বিশ্লেষণে পর্তুগাল উঠে এসেছে শীর্ষ সুবিধাভোগী দেশগুলোর অন্যতম হিসেবে। ইউরোপীয় কমিশনের সাম্প্রতিক শরৎকালীন পূর্বাভাস বলছে, বিশেষ করে পুনরুদ্ধার ও স্থিতিস্থাপকতা পরিকল্পনা (পিআরআর)-এর বরাদ্দ দেশটির রাজস্ব নীতি ও অর্থনৈতিক সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।

এতে পর্তুগালের অর্থনীতি শুধু অভ্যন্তরীণভাবে নয়, বরং বৈশ্বিক শুল্ক নীতি ও আন্তর্জাতিক বাজারেও তুলনামূলক নিরাপদ অবস্থানে থাকবে বলে ধারনা করা হচ্ছে।
ইইউ তহবিল ও জিডিপিতে সরাসরি অবদান
ইউরোপীয় কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ইইউ অনুদানভিত্তিক সরকারি ব্যয় গড়ে জিডিপির ০.২ শতাংশ বাড়বে। কিন্তু কিছু সদস্য রাষ্ট্রে এই প্রভাব আরও বেশি হবে, যার মধ্যে পর্তুগালও রয়েছে শীর্ষে।
ইউরোপজুড়ে যেসব দেশের ইইউ অনুদান জিডিপিতে ১ শতাংশেরও বেশি অবদান রাখবে, সেসব দেশগুলো হলো- বুলগেরিয়া, গ্রিস, লাটভিয়া, পোল্যান্ড, পর্তুগাল ও স্লোভাকিয়া।

এ তালিকায় পর্তুগালের অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটি কোহেশন ফান্ড, পিআরআর এবং অন্যান্য ইউরোপীয় প্রোগ্রামের অধীনে বিশাল পরিমাণ প্রকল্প পরিচালনা করছে।
২০২৭ সালে সম্ভাব্য ব্যয় হ্রাস
২০২৬–এর পরে, অর্থাৎ ২০২৭ সালে ইইউ অনুদানের মাধ্যমে পরিচালিত বাজেটীয় ব্যয় কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।এর কারণ- পুনরুদ্ধার ও স্থিতিস্থাপকতা পরিকল্পনার (পিআরআর/আরআরপি) বরাদ্দ শেষের দিকে যাবে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন নীতি কোহেশন-এর আওতাতেও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বরাদ্দ হ্রাস পাবে।
যেসব দেশে পিআরআর বরাদ্দ তুলনামূলক বেশি (গ্রিস, পর্তুগাল, স্পেন) তাদের বাজেট সম্পৃক্ত ব্যয়ও সেই অনুপাতে কমে আসবে।
রাজস্বনীতির বৈষম্য
ইউরোপীয় কমিশনের বিশ্লেষণ দেখাচ্ছে, ২০২৬ সালে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাজস্ব নীতিতে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যাবে। রোমানিয়ার জিডিপির প্রায় ৩ শতাংশ সংকোচনমূলক নীতি আর এস্তোনিয়ার জিডিপির প্রায় ৩ শতাংশ বিস্তৃত নীতি। অন্যদিকে, কমিশনের মতে, ’পিআরআর’ অনুদান ও অন্যান্য ইইউ তহবিল পর্তুগাল, বুলগেরিয়া, পোল্যান্ড ও গ্রিসে রাজস্ব নীতি সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। এতেই বোঝা যায়, পর্তুগালের আর্থিক নীতি আগামী দুই থেকে তিন বছর তুলনামূলকভাবে সম্প্রসারণধর্মী থাকবে।
পর্তুগালের বাজেট
বাজেটে দুই পক্ষের পূর্বাভাসে পার্থক্য রয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের পূর্বাভাসে ২০২৪ সালে বাজেট সমতা (০ শতাংশ) এবং ২০২৬ সালের ঘাটতি ০.৩ শতাংশ। এদিকে পর্তুগিজ সরকারের পূর্বাভাসে ২০২৪ সালে উদ্বৃত্ত ০.৩ শতাংশ এবং ২০২৬ সালে উদ্বৃত্ত ০.১ শতাংশ। সরকারের হিসেবে অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে, যেখানে কমিশন কিছুটা বেশি সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
দেশীয় বিনিয়োগ ও নিরাপত্তা ব্যয়
ইউরোপীয় কমিশন বলেছে, অধিকাংশ দেশেই দেশীয় অর্থায়নে বিনিয়োগ বাড়বে বা স্থিতিশীল থাকবে, এস্তোনিয়া ও লিথুয়ানিয়াতে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বিনিয়োগ আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে, দশটি সদস্য দেশে জাতীয় বাজেট থেকে বর্তমান ব্যয় কমতে পারে, ফ্রান্স, মাল্টা, অস্ট্রিয়া, ফিনল্যান্ড, পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া, রোমানিয়া এবং আরও কয়েকটি দেশে উল্লেখযোগ্য সংকোচন দেখা যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ও পর্তুগালের ঝুঁকি

ব্রাসেলস যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য শুল্ক বৃদ্ধির প্রভাবও মূল্যায়ন করেছে। যদিও পর্তুগাল সবচেয়ে কম ঝুঁকির দেশগুলোর একটি। এর কারণ- কার্যকর শুল্কহার সবচেয়ে কম দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে পর্তুগালের রপ্তানি পরিমাণ তুলনামূলক কম। এছাড়া কম ঝুঁকির দেশগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে মাল্টা, ক্রোয়েশিয়া, এস্তোনিয়া ও ফ্রান্স। যেসব দেশ ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, লোহা, ভারী যানবাহন, যন্ত্রপাতি রপ্তানি করে, তারা সবচেয়ে বেশি শুল্কের মুখোমুখি হবে। অন্যদিকে বিমান, ওষুধ বা শুল্কমুক্ত পণ্য রপ্তানি করা দেশগুলোর ঝুঁকিও কম।
ইউরোপীয় কমিশনের বিশ্লেষণ এটা অনেকটাই স্পষ্ট যে, ইইউ জোনে যেখানে একাধিক দেশ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে চলছে, সেখানে পর্তুগাল বরং একটি তুলনামূলক সুশৃঙ্খল ও স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পথে হাঁটছে।


