আজ ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বৃহস্পতিবার সকাল ৭:৩০টা থেকে বিকাল ৪:৩০টা পর্যন্ত সারাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ চলছে। একই সঙ্গে একটি গণভোটও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দেড় বছর পর, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরাট পরিবর্তনের মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই নির্বাচন ঐতিহাসিক দিক থেকেও আলাদা, এটি ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় নির্বাচন, যেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পতিত হয়েছে এবং তার দল অংশগ্রহণ করছে না।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে নিবন্ধিত মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন (১২.৭৭ কোটি)। নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫৪ জন ও নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৫ জন।এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছে ১ হাজার ২২০ জন।
এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, নারী ভোটারের অংশগ্রহণ প্রায় সমানুপাতিক, যা বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে নারীর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির ইঙ্গিত বহন করে। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারদের অন্তর্ভুক্তি গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামোর প্রতিফলন।
আজকের ভোটে অংশ নিচ্ছে প্রায় ৫ কোটি যুব ভোটার, যাদের বয়স ১৮–৩৫ বছরের মধ্যে। এরা মোট ভোটারের প্রায় ৪০ শতাংশ! এ কারণেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি ‘জেন-জি’-প্রভাবিত নির্বাচন হিসেবে উল্লেখযোগ্য।
দেশের সবচেয়ে বেশি ভোটারসংখ্যার সংসদীয় আসন গাজীপুর-২, যেখানে ভোটার সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৪ হাজার ৩৩৩ জন। শিল্পাঞ্চল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হওয়ায় এই আসনটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বৃহৎ ভোটারঘনত্বের আসনগুলোতে ফলাফল, জাতীয় চিত্র নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
এবারের নির্বাচনে মোট ২ হাজার ৩৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে ২৭৫ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী, যা নির্দেশ করে যে দলীয় প্রার্থীদের বাইরে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতিরও একটি উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় অনেক আসনে ভোট বিভাজনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা মূল দলগুলোর জয়-পরাজয়ে প্রভাব ফেলতে পারে।
৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে শেরপুর-৩ আসনে একজন প্রার্থীর মৃত্যুজনিত কারণে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। ফলে আজ ভোটগ্রহণ হচ্ছে ২৯৯টি আসনে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট আসনে পরবর্তী সময়ে পুনঃতফসিল ঘোষণা করা হবে।
এবারের নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত। প্রধান দলগুলোর প্রার্থীসংখ্যা, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ২৯১ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৫৮ জন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি ২২৯ জন, জাতীয় পার্টি ১৯৮ জন ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র প্রার্থীসংখ্যা ৩২ জন।
এ নির্বাচন শুধু পার্লামেন্ট গঠনের জন্য নয়, ভোটারেরা গণভোটেও ভোট দিচ্ছেন, যেখানে প্রস্তাবিত সাংবিধানিক সংস্কার “জুলাই সনদ” অনুমোদন করা হবে কিনা তা নির্ধারণ হবে। এর অন্তর্ভুক্ত বিষয়সমূহ, দ্বিচেম্বার বিধানসভা (বাইকমেরাল পার্লামেন্ট), সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংস্কার এবং প্রধানমন্ত্রী মেয়াদসীমা ও ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস ইত্যাদি। কিন্তু সমালোচকরা বলেছেন গণভোটের প্রশ্নগুলো কিছুটা জটিল ও ভোটারদের কাছে সুস্পষ্ট বোঝা কঠিন।
সারাদেশে তীব্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা জারি রাখা হয়েছে, কোস্ট গার্ড থেকে স্থানীয় বাহিনী পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করছে যাতে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত হয়। সংযুক্ত নির্বাচন কমিশন পরিষ্কার বলেছেন, এ নির্বাচন ‘সাজানো নির্বাচন’ হবে না এবং এটি সম্পূর্ণভাবে নিরপেক্ষ ব্যবস্থায় হচ্ছে বলে তারা বিশ্বাস করেন। তবে কয়েকটি কেন্দ্র থেকে ভোটের শুরুতে ধীর গতিসহ ছোটখাটো ঘটনাও ঘটছে।
সম্প্রতি কয়েকটি জরিপ দেখাচ্ছে, ৯২ শতাংশ ভোটার বিশ্বাস করে প্রশাসন নিরপেক্ষ এবং প্রায় ৮১ শতাংশ ভোট দিতে আগ্রহী বলে জানিয়েছে একটি জরিপে। জরিপ প্রস্তাব করেছে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ১৭১-২২২ আসন পেতে পারে যদি উচ্চ ভোটার উপস্থিতি থাকে। আরেক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, ভোটার উপস্থিতি যদি কম হয় তবে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটও শক্ত অবস্থায় থাকতে পারে। এর ফলে আজকের ভোটার উপস্থিতি ও যুব ভোটের ভূমিকা ফলাফলকে চরম প্রভাবিত করবে।
এ ভোটের প্রেক্ষাপটটি বাংলাদেশে গত দুই দশকের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান শেষে শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতা চর্চা বন্ধ। বর্তমান নির্বাচন দুটি শক্তির লড়াই, বিএনপি অংশ নিয়েছে, স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রতিশ্রুতিতে। জামায়াতে ইসলামি নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট, ইসলামী মূল্যবোধ ও সামাজিক নীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে নির্বাচন অংশ নিয়েছেন। বিএনপির চেয়ারম্যান তারিক রহমান ১৭ বছর পর দেশে ফিরে ভোটে অংশ নিচ্ছেন। তাতে পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও পরিবর্তন আনার ইঙ্গিত রয়েছে, বিশেষ করে ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের স্নায়ুবিক বিশ্লেষণ চলছে।
আজকের নির্বাচন মনে করিয়ে দিচ্ছে যে বঙ্গবন্ধুর পর এই প্রথম সংসদ নির্বাচনে আরেকবার জনগণ সরাসরি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় ভোটার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। বিএনপি-জামায়াত মধ্যে টক্কর, যুব ভোটারদের প্রাধান্য, গণভোটে সাংবিধানিক সংস্কারের ভবিষ্যৎ, সব মিলিয়ে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
ফলাফল আগামীকাল (১৩ ফেব্রুয়ারি) ঘোষণা করা হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকসহ রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা এই নির্বাচনের ফলাফলকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তন আনার সুযোগ হিসেবে দেখছেন।


