বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে প্রবাসীদের সরাসরি অংশগ্রহণের স্বপ্ন এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধিত ৫ লক্ষাধিক প্রবাসী বাংলাদেশির ঠিকানায় ডাকযোগে ব্যালট পেপার পাঠানোর এক মহাযজ্ঞ শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইতিমধ্যে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ দেশে অবস্থানরত প্রবাসীদের ব্যালট পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা দেশের নির্বাচনি সংস্কৃতিতে এক যুগান্তকারী ডিজিটাল বিপ্লব হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের আউট অব কান্ট্রি ভোটিং সিস্টেম অ্যান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন (ওসিভি-এসডিআই) প্রকল্পের তথ্যানুযায়ী, গত শুক্রবার ও শনিবার মোট ১০টি দেশে ৪১ হাজার ৫৪৩ জন নিবন্ধিত ভোটারের নামে পোস্টাল ব্যালট ইস্যু করা হয়েছে। তালিকায় সবচেয়ে বেশি ভোটার রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে (৮ হাজার ৪৮০ জন), দক্ষিণ কোরিয়ায় (৭ হাজার ৬৮১ জন) এবং সৌদি আরবে (৭ হাজার ৩৪৩ জন)। এছাড়া মালয়েশিয়া, জাপান, কাতার, কুয়েত, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও চীনে অবস্থানরত ভোটারদের কাছেও ব্যালট পাঠানো হয়েছে।
টিম লিডার সালীম আহমাদ খান জানিয়েছেন, এটি কেবল শুরু; পর্যায়ক্রমে নিবন্ধিত ৫ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি ভোটারের কাছে এই ব্যালট পৌঁছানো হবে। আগামী ২১ জানুয়ারি প্রার্থীদের মাঝে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতীক বরাদ্দ দেবে ইসি। তবে প্রবাসীদের জন্য নিয়মটি কিছুটা নমনীয় করা হয়েছে।
১. যদি কোনো প্রবাসী ভোটার তার পছন্দের প্রার্থীর প্রতীক সম্পর্কে আগে থেকেই নিশ্চিত থাকেন এবং প্রতীক বরাদ্দের আগেই ভোট দিয়ে ব্যালট ফেরত পাঠান, তবে সেই ভোট বাতিল হবে না। তবে ইসি পরামর্শ দিয়েছে প্রতীক বরাদ্দের পর অ্যাপে নিশ্চিত হয়ে ভোট প্রদান করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
২. ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপটি হবে প্রবাসীদের জন্য প্রধান গাইড। প্রতীক বরাদ্দ হওয়ার পর অ্যাপে লগইন করলেই নিজ আসনের প্রার্থীদের তালিকা ও ছবি দেখা যাবে।
একজন প্রবাসী ভোটার যখন ডাকযোগে ইসির খামটি হাতে পাবেন, তার ভেতরে বেশ কিছু প্রয়োজনীয় ফরম পাবেন। এরমধ্যে ফরম নং ৭ হলো মূল ব্যালট পেপার, ফরম নং ৮ একটি ঘোষণাপত্র (যেখানে ভোটারের নাম, এনআইডি ও স্বাক্ষর দিতে হবে)। ফরম-১০ ও ১০ (ক): ব্যালট রাখা ও ফেরত পাঠানোর জন্য ছোট ও বড় খাম। ফরম নং ১১-এ রয়েছে ভোট প্রদানের বিস্তারিত নির্দেশনাবলী।
প্রবাসীদের নির্ভুলভাবে ভোট দিতে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে হবে। খাম প্রাপ্তির পর অ্যাপে লগইন করে খামের ওপরের কিউআর কোড স্ক্যান করতে হবে। এতে ব্যালটটি আপনার নামে বরাদ্দ হিসেবে সিস্টেমে নিবন্ধিত হবে। ব্যালট পেপারে (ফরম-৭) পছন্দের প্রার্থীর প্রতীকের পাশে ফাঁকা ঘরে স্পষ্ট করে টিক (✓) অথবা ক্রস (×) চিহ্ন দিতে হবে।
ফরম-৮ বা ঘোষণাপত্রটি সঠিকভাবে পূরণ করে স্বাক্ষর করতে হবে। মনে রাখবেন, স্বাক্ষরহীন ঘোষণাপত্র থাকলে আপনার ভোটটি বাতিল হয়ে যাবে। কেউ শারীরিকভবে অক্ষম হলে অন্য ভোটারের সাহায্য নিয়ে সত্যায়ন করতে পারবেন। প্রথমে চিহ্নিত ব্যালটটি ছোট খামে (ফরম-১০ ক) ভরে বন্ধ করতে হবে। এরপর সেই ছোট খাম ও স্বাক্ষর করা ঘোষণাপত্রটি বড় খামে (ফরম-১০) প্রবেশ করাতে হবে। বড় খামটি সেলফ-এডহেসিভ বা আঠাযুক্ত, যা সহজেই বন্ধ করা যায়। এটি দ্রুত নিকটস্থ ডাকবক্সে বা পোস্ট অফিসে জমা দিতে হবে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, প্রবাসীদের এর জন্য কোনো ডাকমাশুল বা স্ট্যাম্প খরচ করতে হবে না; এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, জালিয়াতি রোধে এই ব্যালট পেপারে অত্যাধুনিক সিকিউরিটি ফিচার ব্যবহার করা হয়েছে। ভোটাররা তাদের নিজ নিজ মোবাইল অ্যাপ থেকে দেখতে পারবেন ব্যালটটি বর্তমানে কোথায় আছে। ব্যালটটি রিটার্নিং অফিসারের কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ অ্যাপের মাধ্যমে ‘ট্র্যাক’ করা যাবে।
পোস্টাল ব্যালটগুলো রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে সংরক্ষিত থাকবে। ভোট গ্রহণের দিন নির্ধারিত গণনা কক্ষে প্রার্থী বা তাদের নির্বাচনি এজেন্টদের উপস্থিতিতে এই ভোটগুলো গণনা করা হবে। গণমাধ্যমকর্মী ও পর্যবেক্ষকরাও এই প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণে অংশ নেওয়ার এই সুবর্ণ সুযোগ প্রবাসীদের জাতীয় মূলধারায় সম্পৃক্ত করবে। নির্বাচন কমিশনের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করতে প্রবাসীদের সচেতনতা ও দ্রুত ব্যালট ফেরত পাঠানো অত্যন্ত জরুরি।


