বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে রেমিট্যান্স প্রবাহের মূল উৎস হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপ, বিশেষ করে ইতালি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, গ্রিস, পর্তুগাল ও জার্মানি বাংলাদেশি প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে উঠে এসেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ইউরোপের স্থিতিশীল শ্রমবাজার, উচ্চ আয়ের সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের সুবিধা রেমিট্যান্স আয়কে আরও শক্তিশালী করেছে।
যেসব কারণে রেমিট্যান্স বাড়ছে
মধ্যপ্রাচ্যের তুলনায় ইউরোপে গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাসের হার বেশি। অনেকেই কাজের পাশাপাশি ব্যবসা, রেস্টুরেন্ট, সার্ভিস সেক্টর, ডেলিভারি, কৃষি ও নির্মাণ খাতে যুক্ত হয়েছেন। ফলে তাদের উপার্জন তুলনামূলক বেশি এবং স্থিতিশীল। ইউরোপে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে এখন ব্যাংকিং চ্যানেলের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এতে রেমিট্যান্সের পরিমাণও স্বচ্ছ ও পরিমাপযোগ্য হয়েছে। ইউরোপে পরিবার নিয়ে থাকা খরচবহুল হওয়ায় অনেকেই পরিবার দেশে রেখে উপার্জনের বড় অংশ পাঠিয়ে দেন।
যেসব দেশগুলো সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে
ইতালিতে প্রায় দেড় লক্ষ বাংলাদেশি বসবাস করেন। কৃষি, রেস্টুরেন্ট, নির্মাণ, টেক্সটাইল ও ব্যক্তিগত পরিষেবা খাতে বাংলাদেশিদের বড় অংশ কাজ করেন। সাম্প্রতিক হিসেবে, বাংলাদেশে পাঠানো মোট রেমিট্যান্সের ১২–১৪ শতাংশ ইতালি থেকে আসে।
লন্ডন, বার্মিংহাম ও ম্যানচেস্টারসহ বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের বহু ব্যবসা রয়েছে। দেশটিকে এখনও রেমিট্যান্সের সর্বোচ্চ ৫ উৎস দেশের একটি ধরা হয়।
স্পেনে প্রায় ৮০ হাজার বাংলাদেশি আছেন। দক্ষিণ স্পেনের কৃষিখাত, রেস্টুরেন্ট এবং ট্যুরিজম সেক্টরে বাংলাদেশিদের বড় অংশ নিয়োজিত।
গ্রিসে প্রায় ৫০–৬০ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক আছেন। ২০২৩ সাল থেকে অনেক শ্রমিকের কাগজপত্র বৈধ হওয়ায় ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠানো রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পেয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্তুগাল হয়ে উঠেছে বাংলাদেশিদের নতুন গন্তব্য। স্থায়ী বসবাসের সুযোগ, ব্যবসার স্বাধীনতা এবং দ্বিগুণ চাকরির সুযোগ রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবদান
ইউরোপ থেকে নিয়মিত বৈধ পথে পাঠানো রেমিট্যান্স বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে স্থিতিশীল করেছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ রেমিট্যান্সপ্রাপ্ত পরিবার গ্রামে বাস করে। ইউরোপ প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ, জমি কেনা, ব্যবসা শুরু, নতুন বাড়ি নির্মাণ, সন্তানদের উচ্চশিক্ষা ও আর্থিক নিরাপত্তা এই পাঁচ ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনছে। এছাড়া ইউরোপফেরত অনেক শ্রমিক দেশে এসে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা শুরু করছেন। খাবারের দোকান, ই-কমার্স, কৃষি, পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতেও তারা অবদান রাখছেন।
চ্যালেঞ্জ
ইউরোপের কঠোর অভিবাসন নীতি, অবৈধ পথে যাওয়া শ্রমিকদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, উচ্চ ভাড়ার বাজার ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ভাষাগত বাধা ও স্থায়ী স্ট্যাটাস পেতে দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এই চ্যালেঞ্জগুলো রেমিট্যান্স পাঠানোর সক্ষমতা কমাতে পারে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
অর্থনীতিবিদদের মতে, ইউরোপ প্রবাসীরা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হয়ে দাঁড়াবে। এ বিষয়ে তারা বলেন, ইউরোপে এখন প্রতিনিয়ত বাংলাদেশী নতুন অভিবাসী শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে, একইসাথে গোটা ইউরোপে বাড়ছে দক্ষ কর্মীদের চাহিদাও। এছাড়াবর্তমানে ডিজিটাল রেমিট্যান্স পরিষেবা সাশ্রয়ী, আর ইউরোপে পরিবার নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা কমে যাওয়ায়, প্রবাসীরা এখন দেশে বেশি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন।
সব মিলিয়ে ইউরোপ আগামী দশকে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স উৎসের অন্যতম বৃহৎ অংশ হয়ে উঠতে পারে।


