পর্তুগালের স্থানীয় নির্বাচনে বদলে গেল ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ। একদিকে যখন প্রধানমন্ত্রী লুইস মন্টিনিগ্রোর দল নিরঙ্কুশ ক্ষমতার পথে, তখন অন্যদিকে কট্টর ডানপন্থী শেগার উত্থান এবং বিরোধী সোশালিস্ট পার্টির ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই জন্ম দিয়েছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের।
স্থানীয়, আঞ্চলিক ও জাতীয়—সব স্তরে ক্ষমতা এখন লুইস মন্টিনিগ্রোর সরকারের হাতে, আর সেই সঙ্গে বেড়েছে তাদের দায়িত্বও। অন্যদিকে, সোশ্যালিস্ট পার্টির সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ—আবারও জয়ীর দলে ফিরতে হবে তাদের।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, লুইস মন্টেনেগ্রোর সামনে এখন দেশের পুনর্গঠনের এক ‘অন্যরকম সুযোগ’। প্রশ্ন হচ্ছে, এই সময়টা কি সত্যিই সংস্কারের সময়? লুসোফোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোসে ফিলিপে পিন্টো বলছেন, সরকারের এখন জাতীয় দায়িত্ব হলো সংস্কারমুখী চেতনা নিয়ে কাজ করা। তার মতে, রাষ্ট্রকে পুরোপুরি বদলানো সম্ভব নয়, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোতে সংস্কার আনা সম্ভব। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও শ্রম—সব ক্ষেত্রেই দরকার এমন প্রশাসনিক সংস্কার। তার মতে, এখন পর্যন্ত কেবল শ্রমমন্ত্রী মারিয়া দো রোজারিও পালমা রামালিওই সংস্কারমুখী মানসিকতা দেখিয়েছেন। তবে শ্রম আইনে তার কিছু প্রস্তাব, বিশেষ করে প্যারেন্টহুড সংক্রান্ত অংশগুলো, বিতর্কের মুখে পড়েছে। তবুও, পিন্টো মনে করেন—এই সংস্কারের লড়াইয়ে সরকারকে প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়তে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ব্রুনো ফেরেইরা কস্তার মতে, স্থানীয় নির্বাচনে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ মন্টেনেগ্রোকে দিয়েছে সংস্কারের নতুন গতি ও বৈধতা। তার ভাষায়, এখন এই সুযোগ হাতছাড়া করলে দেশ পিছিয়ে পড়বে, আর ফ্রান্স ও জার্মানির মতো রাজনৈতিক অস্থিরতায় জর্জরিত হতে পারে পর্তুগাল।
অন্যদিকে, বিশ্লেষক জোয়াও পাসেকো বলছেন, সরকারের সাম্প্রতিক বাজেট প্রস্তাবে বড় ধরনের সংস্কার না রাখাটা ছিল কৌশলগত সিদ্ধান্ত। তার মতে, নির্বাচনের ফলের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব না ফেলতে চেয়েই এই সতর্কতা অবলম্বন করেছে সরকার। তিনি মনে করেন, স্থানীয় নির্বাচনের ফলের পর এখন সব দলই নিজেদের অবস্থান ও বয়ান তৈরি করবে ২০২৬ সালের বাজেট আলোচনা ঘিরে।
এদিকে, এই নির্বাচন কট্টর ডানপন্থী দল শেগার জন্য ছিল একাধারে বিজয় এবং বিপর্যয়ের। স্থানীয় নির্বাচনে জয়ের লক্ষ্য পূরণ না হলেও দেশজুড়ে তাদের ভোট বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। এখন প্রশ্ন হলো, স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে শেগা কি পর্তুগালের রাজনীতিতে ‘রেড লাইন’ মুছে দেবে?
আন্দ্রে ভেনচুরার দল মাত্র তিনটি মিউনিসিপ্যাল দখল করতে পেরেছে—তার আগের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ৩০টি।
তবুও, ব্রুনো ফেরেইরা কস্তার মতে, শেগা এখন স্থানীয় রাজনীতিতে আগের চেয়ে অনেক বেশি উপস্থিতি দেখিয়েছে—১৯ জন কাউন্সিলর থেকে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩০-এর বেশি, আর ভোটও বেড়েছে তিনগুণের বেশি।
জোসে ফিলিপে পিন্টো মনে করেন, শেগার প্রার্থীদের বাছাইয়ে ভুলই তাদের বড় ক্ষতি করেছে।
তবুও, দলটি বিভিন্ন জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে দৃশ্যমানভাবে, বিশেষ করে সেতুবালে—যেখানে অল্পের জন্যই তিনটি মিউনিসিপ্যালয় জয় হারিয়েছে তারা।
এখন প্রশ্ন, যেসব মিউনিসিপ্যালয় কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি, সেখানে শেগার ভূমিকা কী হবে?
বিশ্লেষকদের মতে, নীতিনির্ধারণের আলোচনায় এখন ‘রেড লাইন’ বা সীমারেখাগুলো আগের চেয়ে অনেক অস্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে, নতুন এই রাজনৈতিক সমীকরণে সোশ্যালিস্ট পার্টিও কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে।
যদিও তারা লিসবন ও পোর্তোয় হেরেছে, তবুও অর্ধেক জেলা রাজধানীতে জিতেছে।
এই ফলাফল তাকে আবারও শক্ত অবস্থানে ফিরিয়ে এনেছে তাদের নেতা জোসে লুইস কারনেইরোকে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ফলাফল তার নেতৃত্বকে আরও দৃঢ় করেছে, এবং তিনি এখন কার্যত সরকারের প্রধান বিরোধীদলীয় নেতায় পরিণত হয়েছেন।
শেষ পর্যন্ত, এ নির্বাচনে একদিকে এসেছে পরিবর্তনের ইঙ্গিত, এই তিন শক্তির টানাপোড়েনই নির্ধারণ করবে পর্তুগালের আগামী দিনের রাজনীতি। লুইস মন্টিনিগ্রো কি পারবেন তার সংস্কারের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে? শেগা কি তাদের উত্থানকে স্থায়ী রূপ দিতে পারবে? আর সোশালিস্ট পার্টি কি পারবে জনগণের আস্থা পুনরায় অর্জন করতে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে পর্তুগালের ভবিষ্যৎ।


