ইউরোপের নেতারা বলেছেন, ইউক্রেনের জন্য সমর্থন বাড়াতে এবং যুদ্ধ শেষ করতে রাশিয়ার উপর চাপ সৃষ্টি করবেন তারা। বর্তমান সময়কে তারা সংকটপূর্ণ বলে মনে করছেন। ৮ ডিসেম্বর সোমবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি লন্ডনে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন এবং জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ ম্যাৎসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। গত সপ্তাহে ইউক্রেনীয় ও মার্কিন কর্মকর্তাদের তৈরি করা শান্তি পরিকল্পনার সর্বশেষ সংস্করণ নিয়ে তারা আলোচনা করেন।

লন্ডন থেকে ন্যাটো কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করতে ব্রাসেলসে রওনা হওয়ার আগে জেলেনস্কি জানান, ইউক্রেন ৯ ডিসেম্বর মঙ্গলবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি সংশোধিত পরিকল্পনা দেবে। ইউরোপীয় নেতারা বলেছেন, ইউক্রেনের জন্য নিরাপত্তা গ্যারান্টি পেতে আরও কাজ করা দরকার। কারণ, রাশিয়ার সঙ্গে দ্রুত একটি চুক্তিতে রাজি হওয়ার জন্য ইউক্রেনকে চাপ দিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা ফ্লোরিডায় মার্কিন আলোচক দলের সঙ্গে মিলে মার্কিন-সমর্থিত শান্তি প্রস্তাবে পরিবর্তন আনতে চাইছিলেন। প্রস্তাবটি ব্যাপকভাবে রাশিয়ার পক্ষে বলে মনে করা হয়েছিল। লন্ডনে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে জেলেনস্কি বলেন…
নভেম্বরে প্রস্তাবিত প্রাথমিক চুক্তিতে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে থাকা ইউক্রেনবিরোধী বিষয়গুলো বাদ দেওয়া হয়েছে।
তবে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট স্বীকার করেছেন, তার দেশের ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে কিছু উদ্বেগ এখনও রয়ে গেছে। ওই ইস্যুতে এখনও আপস-রফা হয়নি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাব করেছে, ইউক্রেন যেন দেশটির পূর্বাঞ্চল থেকে তাদের সামরিক বাহিনী পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেয়। অঞ্চলগুলো রাশিয়া জোর করে দখল করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু পুরোপুরি পেরে ওঠেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তার বিনিময়ে রাশিয়া ইউক্রেনের অন্য এলাকা থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহার করবে এবং যুদ্ধবিরতি হবে।
কিন্তু এই প্রস্তাবটি জেলেনস্কির পছন্দ নয়। তিনি রাশিয়াকে আগ্রাসনের পুরস্কার পেতে দিতে রাজি নন। তিনি বারবার সতর্ক করেছেন…
পূর্বাঞ্চলের যেকোনো ঘাঁটি ভবিষ্যতে আক্রমণ শুরু করার জন্য ব্যবহার করবে রাশিয়া।
তিনি বলেন, মার্কিনিরা নীতিগতভাবে একটি আপসের রাস্তা বের করার চেষ্টায় আছেন। জেলেনস্কি আরও বলেন, নিরাপত্তা গ্যারান্টির বিষয়টি এখনও মীমাংসা হয়নি। ইউক্রেন চায়, রাশিয়া ভবিষ্যতে আক্রমণ চালানোর আগ্রহ হারাবে, তা এই চুক্তির মাধ্যমে নিশ্চিত করা হোক।
ইউরোপীয় নেতারা কী বলছেন? যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, নেতারা সবাই একমত যে, একটি সংকটপূর্ণ মুহূর্ত চলছে। চলমান বর্বর যুদ্ধ শেষ করার জন্য ইউরোপকে অবশ্যই ইউক্রেনকে সমর্থন এবং পুতিনের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে হবে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নেতারা ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শান্তি আলোচনার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন। ইউক্রেনের জন্য শক্তিশালী নিরাপত্তা গ্যারান্টিযুক্ত একটি ন্যায়সঙ্গত ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তির প্রয়োজনের ওপর জোর দিয়েছেন কিয়ার স্টারমার।
জার্মানির চ্যান্সেলর ম্যাৎস বলেছেন…
তিনি মার্কিন পক্ষের সম্ভাব্য পরিকল্পনার কিছু ব্যাপারে সন্দেহবাদী।
আবার আলোচনার ধীরগতির কারণে বিরক্ত হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের ওপর থেকে তাদের সমর্থন তুলে নিতে পারে বলে ইউক্রেন এবং ইউরোপে উদ্বেগ রয়েছে। জেলেনস্কি লন্ডনে বলেছেন, মার্কিনিদের ছাড়া তারা চলতে পারেন না, ইউরোপকে ছাড়াও চলতে পারেন না। সেই কারণেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে, বলেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট।
কিয়েভ এবং মস্কোকে যুদ্ধ শেষ করার জন্য পরিকল্পনা দ্রুত মেনে নিতে হোয়াইট হাউস চাপ দিলেও, কোনো বড় ফল ফলেনি। গত সপ্তাহে মস্কোয় মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে পাঁচ ঘণ্টার বৈঠক কোনো বাস্তব ফল দিতে পারেনি। তবে মিয়ামিতে জেলেনস্কির প্রধান আলোচক রুস্তেম উমেরভ এবং মার্কিন পক্ষের মধ্যে তিন দিনের আলোচনার পর দুই পক্ষ থেকেই অগ্রগতির অস্পষ্ট কিন্তু ইতিবাচক বিবৃতি এসেছে।

তবে, ৭ ডিসেম্বর রবিবার ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, জেলেনস্কি সংশোধিত চুক্তির খসড়াটি এখনও পড়েননি। এই কারণে তিনি কিছুটা হতাশ বলেও জানান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জোর দিয়ে বলেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন খসড়াটি মানতে রাজি আছেন।
গুরুতর অর্থনৈতিক চাপ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ক্রমাগত ক্ষতির পরেও রাশিয়া তাদের মূল দাবিগুলো নিয়ে আপস করার খুব একটা উৎসাহ দেখাচ্ছে না। দেশটি ইউক্রেনের ন্যাটো সামরিক জোটে যোগদানের রাস্তা বন্ধ করতে চায়। গত সপ্তাহে দনিয়েস্ক এবং লুহানস্ক অঞ্চলের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না নেওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা জানিয়েছেন পুতিন। বর্তমানে অঞ্চলগুলোর ৮৫ শতাংশই রাশিয়ান সেনাবাহিনীর দখলে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে আলোচনা চললেও, ইউক্রেনে যুদ্ধ চলছে। ৭ ও ৮ ডিসেম্বরের মধ্যে ড্রোন, গ্লাইড বোমা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী নয়টি অঞ্চলে আক্রমণ চালিয়েছে। এতে ১০ জন প্রাণ হারিয়েছে। ৪৭ জন আহত হওয়ার খবর মিলেছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণ আক্রমণ শুরু করেছিল রাশিয়া। তারপর থেকে হাজার হাজার সামরিক-বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছে। ইউক্রেনের শহরগুলো প্রায় প্রতি রাতেই হামলার শিকার হচ্ছে।


