গ্রিসের পর্যটন স্বর্গ হিসেবে পরিচিত ক্রিট দ্বীপ এখন অভিবাসীদের প্রধান ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। গত এক বছরে এই দ্বীপে অভিবাসী আগমনের হার বেড়েছে অভাবনীয়ভাবে। নীল জলরাশি আর ছবির মতো সুন্দর গ্রিক দ্বীপ ক্রিট ও গাভদোস এখন খবরের শিরোনামে, তবে পর্যটনের জন্য নয়। ভূমধ্যসাগরের এই শান্ত দ্বীপগুলো এখন লিবিয়া থেকে আসা হাজার হাজার অভিবাসীর প্রধান গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এখানে অভিবাসী আগমনের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২০০ শতাংশের বেশি, যা গ্রিক সরকার ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে।
তোব্রুক রুট
এতদিন তুরস্ক থেকে এজিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে প্রবেশের পথটি পরিচিত থাকলেও, বর্তমানে লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় শহর ‘তোব্রুক’ থেকে শুরু হওয়া নতুন একটি সমুদ্রপথ এখন সবচেয়ে সক্রিয়। এই পথে পাড়ি দিয়ে ২০২৫ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৮ হাজার অভিবাসী ক্রিট ও গাভদোস দ্বীপে পৌঁছেছেন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৫ হাজার। সম্প্রতি মাত্র তিন দিনে প্রায় ৯০০ অভিবাসীর আগমন স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে রীতিমতো হিমশিম খাইয়ে দিয়েছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিশর এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিন ও সুদানের নাগরিকরা রয়েছেন। দালাল চক্রকে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ ইউরো দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরার ছোট নৌকায় গাদাগাদি করে তারা এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছেন।
আবাসন সংকট ও মানবিক পরিস্থিতি
হঠাৎ এই বিপুল সংখ্যক মানুষের চাপ সামলানোর মতো পর্যাপ্ত পরিকাঠামো ক্রিট বা গাভদোস দ্বীপে নেই। ল্যাবসোস বা সামোস দ্বীপের তুলনায় এখানে অভিবাসীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি হলেও স্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রের অভাব প্রকট। অধিকাংশ অভিবাসীকে আগিয়া প্রদর্শনী কেন্দ্রের মতো অস্থায়ী জায়গায় রাখা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে এক মাস বয়সি শিশু থেকে শুরু করে গর্ভবতী নারীরাও রয়েছেন, যাদের জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ছে।
গ্রিক সরকারের অবস্থান
অভিবাসীদের এই স্রোত ঠেকাতে গ্রিস সরকার এখন জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। এথেন্সের নতুন আইন ও পদক্ষেপগুলো অভিবাসীদের জন্য এক কঠিন বার্তা দিচ্ছে। লিবিয়া থেকে আসা নৌকা আটকাতে তিনটি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে। ইটালির আদলে লিবীয় কোস্টগার্ডের সাথে চুক্তি করছে গ্রিস, যাতে সমুদ্রেই নৌকাগুলো আটকে ফেরত পাঠানো যায়। উত্তর আফ্রিকা থেকে আসা অভিবাসীদের আবেদন প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি পাস হওয়া আইন অনুযায়ী, অনিয়মিতভাবে গ্রিসে অবস্থান করা এখন ফৌজদারি অপরাধ। যাদের আশ্রয়ের আবেদন বাতিল হবে, তাদের জন্য ২ থেকে ৫ বছরের জেল এবং ১০ হাজার ইউরো জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে গ্রিক অভিবাসনমন্ত্রী থানোস প্লেভরিস-এর বার্তাটি পরিষ্কার। হয় নিজ দেশে ফিরে যান, না হলে কারাগারে যেতে হবে।
ভবিষ্যৎ গন্তব্য
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) মনে করছে, গ্রিসের এই কঠোর আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো দ্রুত বহিষ্কার নিশ্চিত করা। গ্রিস এখন স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, তারা কেবল সেই বিদেশিদেরই গ্রহণ করবে যাদের শ্রমবাজারে প্রয়োজন, বাকিদের জন্য তাদের দরজা এবং আইন, উভয়ই এখন অত্যন্ত কঠিন।


