ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসন ও আশ্রয় নীতির জটিলতার সম্মুখীন। ২০১৫ সালের শরণার্থী সংকটের পর থেকে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ ইউরোপে আশ্রয় আবেদন করছে, যা অনেক সদস্য রাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন দেশে নীতি ও প্রক্রিয়ার মধ্যে পার্থক্য থাকায় অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীকে সমন্বিতভাবে সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইইউ নতুন একটি ঐক্যবদ্ধ আশ্রয় কাঠামো প্রণয়ন করতে যাচ্ছে, যা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, আইনগত বোঝাপড়া তৈরি করা এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে গৃহীত হয়েছে।
ইইউ কাউন্সিল সম্প্রতি এই নতুন নীতি সমর্থন করেছে, যা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়ার দ্রুততা, সুষ্ঠু তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নিরাপদ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করবে। নতুন নীতির একটি মূল দিক হলো “নিরাপদ তৃতীয় দেশ” এবং “নিরাপদ উৎস দেশ” সংক্রান্ত নির্দেশিকা। এর মাধ্যমে অভিবাসী বা আশ্রয়প্রার্থীকে এমন দেশে ফেরত পাঠানো হবে, যেখানে তার নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সুরক্ষা নিশ্চিত। বিশেষ করে, যেসব আবেদনকারীর সেই দেশে পূর্ববর্তী সংযোগ রয়েছে বা যেখান থেকে তারা ইইউতে এসেছে, তাদের ফেরত প্রক্রিয়ার জন্য এই নীতিমালা প্রযোজ্য হবে। এছাড়াও, ইইউ ও তৃতীয় দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক চুক্তির ভিত্তিতেও এটি প্রয়োগ করা হবে।
নতুন নীতির উদ্দেশ্য হলো সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বোঝা ভাগাভাগি করা এবং আশ্রয় আবেদনগুলো দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিষ্পত্তি করা। ইইউ কাউন্সিলের সমর্থন শুধু রাজনৈতিক ঐক্য নয়, বরং অভ্যন্তরীণ বাজারের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সদস্য দেশ গত কয়েক বছরে অনিয়মিত অভিবাসীদের প্রবাহের কারণে চাপের সম্মুখীন হয়েছে। নতুন নীতিগুলো এই চাপ কমানোর জন্য এক কাঠামো প্রদান করে, যেখানে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দায়বদ্ধতা এবং সংস্থান ভাগাভাগি করা যায়।
তবে নতুন নীতি নিয়ে মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো থেকে উদ্বেগও প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ করে, নির্ধারিত সুরক্ষা মান, আশ্রয় প্রার্থীদের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং ফেরত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইউএনএইচসিআরও নতুন ইইউ ফেরত নীতিতে প্রক্রিয়াগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। ইইউ নীতি প্রণেতারা এই সমালোচনা মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং জানিয়েছেন যে আন্তর্জাতিক আইন এবং ইউরোপীয় আইনি কাঠামোর পূর্ণ সম্মান রেখে নীতিগুলো বাস্তবায়ন করা হবে।
নতুন আশ্রয় নীতিতে বোঝা ভাগাভাগি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা তহবিল এবং আর্থিক বা অপারেশনাল সহায়তার মাধ্যমে জোরালোভাবে প্রভাবিত দেশের উপর চাপ কমানো হবে। পুনর্বিন্যাসের নির্দিষ্ট সংখ্যা এবং অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ নির্ধারিত হবে, যাতে সমস্ত সদস্য দেশের দায়বদ্ধতা স্পষ্ট হয়। এর ফলে, ইইউ’র মধ্যে বৈধ আশ্রয় প্রক্রিয়া এবং মানবিক দিকগুলোর সমন্বয় আরও সুসংগঠিত হবে।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আইনগত কাঠামোতে নতুন আশ্রয় প্রক্রিয়াসমূহ কার্যকর করা হবে। সংশোধিত নীতিগুলো সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সরাসরি প্রযোজ্য হবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় কমে যাবে। ইইউ দেশগুলো খোলা চুক্তি এবং নিরাপদ তৃতীয় দেশ সম্পর্কিত সমঝোতা প্রসারিত করবে, যাতে আশ্রয় প্রার্থীদের স্থানান্তরিত প্রক্রিয়াসমূহ আরও দক্ষ ও সুসংগঠিত হয়।
এই নীতি মানবিক সহায়তা, নিরাপত্তা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সমন্বিত প্রতিক্রিয়ার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে। এটি শুধুমাত্র সীমান্তে কঠোরতা নয়, বরং অভ্যন্তরীণ নীতি ও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এক কার্যকর কাঠামো গঠন করছে। ইউরোপীয় কমিশন, পার্লামেন্ট এবং কাউন্সিলের যৌথ প্রচেষ্টা আশ্রয় প্রক্রিয়ার দ্রুততা, কার্যকারিতা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বোঝা ভাগাভাগি নিশ্চিত করছে।
উপসংহারে, ইইউর নতুন আশ্রয় নীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যা ইউরোপীয় দেশগুলোকে অভিবাসন ও আশ্রয় নীতিতে আরও কার্যকর, মানবিক এবং আইনিভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলবে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বোঝাপড়া, বৈশ্বিক মানবাধিকার মানের সম্মান এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে নীতি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করবে। মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তা সমাধান করার জন্য ইইউ আরও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয় করবে, যাতে কঠোরতা এবং মানবিক অধিকার উভয়ই রক্ষা পায়।


