ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধ ও দীর্ঘস্থায়ী ইজরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতে বিশ্বজুড়ে যেমন জনমানুষের ক্ষোভ বাড়ছে, তেমনি ইউরোপেও ইসরায়েলবিরোধী বয়কট, ডাইভেস্টমেন্ট এবং স্যাংশনস(বিডিএস)আন্দোলন নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। এই আন্দোলন শুধু রাস্তায় বিক্ষোভে সীমাবদ্ধ নেই, এখন তা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাব্যবস্থায়ও প্রভাব ফেলছে।
দুই হাজার দশকের মাঝামাঝি,“বিডিএস” নামে একটি আন্তর্জাতিক বয়কট আন্দোলন শুরু হয়, যার মূল দাবি, ইসরায়েলের অবৈধ দখল এবং আইনি লঙ্ঘন শেষ না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি পণ্য ও প্রতিষ্ঠান বর্জন, বিনিয়োগ প্রত্যাহার এবং শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক কাটা।এটি মূলত মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে দাবি তুলেছে।
সম্প্রতি ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় এই আন্দোলন অনেকাংশে গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের রূপ নিতে শুরু করেছে। অর্ধ-সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা, শ্রমিক ইউনিয়ন ও খুচরা ব্যবসাগুলো ইসরায়েলি পণ্য স্ক্রিন বা বিক্রয় থেকে বিরত থাকতে বলছে। একাধিক ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে একাডেমিক বা গবেষণা সম্পর্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বা আলোচনা করেছে , এ ধরণের অধ্যাপক, সম্মিলিত গবেষণা ও এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামেও বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। ইউরোপের কিছু রাজনৈতিক দল, শ্রমিক ইউনিয়ন বা সিভিল সোসাইটি গোষ্ঠী ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের প্রতি তাদের দেশ বা ইইউ পর্যায়ে নীতি সংশোধনের ডাক দিয়েছে।
ইউরোপের বিক্ষোভগুলো মূলত, রাস্তা মিছিল ও জনসমাবেশ, পোকার্ড সহ বয়কটের আহ্বান, বড় ব্রান্ড বা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ ও কর্মচারী ইউনিয়ন দ্বারা ইসরায়েলি পণ্য পরিচালনার বিরোধিতা করছে, এতে ব্যবসায়িক পরিবেশেও চাপ তৈরি হয়েছে। এক ভিডিও রিপোর্টে দেখা গেছে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ এতে অংশ নিচ্ছে, যদিও কিছু স্থানে কঠোর পুলিশি সতর্কতাও দেখা গেছে।
বিশ্বজুড়ে বয়কট আন্দোলন ইউরোপে সীমাবদ্ধ নেই, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায়ও সমর্থন ও বিক্ষোভ দেখা গেছে, যেখানে অনেক ব্যবসা এবং আন্তর্জাতিক ইভেন্টে ইসরায়েল সম্পর্কিত অংশগ্রহণ বা স্পন্সরশিপ নিয়েও বিতর্ক চলছে। কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, এ ধরনের আন্দোলন সরকারগুলোকেও নীতিগত অবস্থান পুনর্বিচার করতে বাধ্য করছে, অর্থাৎ কেবল ব্যক্তিগত বয়কট থেকে এটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে পরিণত হচ্ছে।
বয়কট আন্দোলনের সমালোচকরা এটিকে একদিকে “অ্যান্টি‑সেমিটিজম বা বৈষম্যের আড়াল” হিসাবে দেখানোর চেষ্টা করেন (যদিও অনেক বিক্ষোভকারী আলাদা করে ইসরায়েলের রাজনীতি ও ইহুদিদের ধর্মভুক্ত ব্যক্তিদের আলাদা বলেন)। এ বিষয়ে বিভিন্ন দেশে নানা আইনি ও নীতিগত বিতর্কও চলছে।
বিদেশী নীতি বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়নে সাধারণ মানুষের মতের প্রভাব বাড়ছে। সরাসরি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে এখানেও আন্দোলনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এক দেশ বা অঞ্চলের আন্দোলন এখন বৈশ্বিক শৃঙ্খলায় জড়িয়ে পড়ছে। এতে ভবিষ্যতে বৈদেশিক নীতি, বাণিজ্য চুক্তি এবং সামাজিক মতামতের ভূমিকা কীভাবে বদলে যাবে, তা নজরদারি করার মতো বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।


