২০২৬ সালের শুরুতে ইউরোপজুড়ে ন্যূনতম বেতন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাট–এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২৭টি ইইউ দেশের মধ্যে ২২টিতে সরকার নির্ধারিত মাসিক ন্যূনতম বেতন কার্যকর রয়েছে। বাকি পাঁচটি দেশ, ডেনমার্ক, ইতালি, অস্ট্রিয়া, ফিনল্যান্ড এবং সুইডেন, এখনও আইনগতভাবে নির্ধারিত জাতীয় ন্যূনতম বেতন চালু করেনি। তবে এসব দেশে শ্রমিক ইউনিয়ন ও নিয়োগকর্তাদের মধ্যে খাতভিত্তিক চুক্তির মাধ্যমে বেতন নির্ধারণ করা হয়, যা কার্যত অনেক ক্ষেত্রে সরকারি ন্যূনতম বেতনের সমতুল্য সুরক্ষা দেয়।
২০২৬ সালে ইউরোপে সর্বোচ্চ ন্যূনতম বেতন নির্ধারিত হয়েছে লুক্সেমবার্গে, যেখানে মাসিক ন্যূনতম বেতন ২ হাজার ৭০০ ইউরোর বেশি। এর পরেই রয়েছে আয়ারল্যান্ড, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস এবং বেলজিয়াম, যেখানে মাসিক ন্যূনতম বেতন দুই হাজার ইউরোর আশেপাশে বা তার বেশি। পশ্চিম ও উত্তর ইউরোপের এই দেশগুলোতে অর্থনীতি শক্তিশালী, শিল্প ও সেবা খাত উন্নত, এবং শ্রমিক অধিকার ঐতিহাসিকভাবে সুসংগঠিত হওয়ায় ন্যূনতম বেতনের স্তর তুলনামূলকভাবে অনেক উঁচু।
অন্যদিকে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে ন্যূনতম বেতন অনেক কম। যেমন বুলগেরিয়াতে মাসিক ন্যূনতম বেতন ৬২০ ইউরো, যা ইইউভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। এর কাছাকাছি রয়েছে রোমানিয়া, লাটভিয়া, হাঙ্গেরি এবং এস্তোনিয়া। এসব দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাড়লেও গড় আয় ও উৎপাদনশীলতা এখনও পশ্চিম ইউরোপের তুলনায় কম, ফলে ন্যূনতম বেতনও সেই অনুযায়ী নিচু স্তরে অবস্থান করছে।
তবে কেবল ইউরোতে সংখ্যাগত তুলনা করলে প্রকৃত চিত্র ধরা পড়ে না। কারণ জীবনযাত্রার ব্যয় দেশভেদে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। লুক্সেমবার্গ বা জার্মানির মতো দেশে বাড়িভাড়া, স্বাস্থ্যসেবা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অনেক বেশি। তাই ক্রয়ক্ষমতা সমতা বা পারচেসিং পাওয়ার স্ট্যান্ডার্ড (পিপিএস) বিবেচনায় নিলে পার্থক্য কিছুটা কমে আসে। অর্থাৎ, কম বেতনের দেশগুলোতে খরচও তুলনামূলক কম হওয়ায় প্রকৃত জীবনমানের ব্যবধান কিছুটা সংকুচিত হয়। তবুও সামগ্রিকভাবে পশ্চিম ইউরোপে জীবনযাত্রার মান এখনও এগিয়ে।
২০২৬ সালে ন্যূনতম বেতন বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম বড় কারণ ছিল মূল্যস্ফীতি। কোভিড-পরবর্তী সময়, জ্বালানি সংকট এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতার কারণে ইউরোপের অনেক দেশেই মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। ফলে সরকারগুলো শ্রমিকদের আয় সুরক্ষিত রাখতে ন্যূনতম বেতন বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, হাঙ্গেরি চলতি বছরে প্রায় ১০ শতাংশের বেশি বেতন বৃদ্ধি করেছে, যদিও দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক দুর্বল। একইভাবে জার্মানিতেও গত কয়েক বছরে ধাপে ধাপে ন্যূনতম বেতন বাড়ানো হয়েছে, যাতে নিম্ন আয়ের শ্রমিকরা মূল্যস্ফীতির চাপে টিকে থাকতে পারেন।
তবে ন্যূনতম বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সবসময় ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া আনে না। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, অতিরিক্ত দ্রুত বেতন বৃদ্ধি ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষত যেসব খাতে শ্রমনির্ভর উৎপাদন বেশি, যেমন রেস্তোরাঁ, খুচরা বিক্রয় বা কৃষিখাত, সেখানে শ্রম ব্যয় বেড়ে গেলে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, ন্যূনতম বেতন বৃদ্ধি ছাড়া নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য সম্মানজনক জীবনযাপন সম্ভব নয়। এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যেই ইউরোপের নীতিনির্ধারকরা ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছেন।
যেসব দেশে আইনগত ন্যূনতম বেতন নেই, যেমন ডেনমার্ক বা সুইডেন, সেখানে শ্রমবাজারের কাঠামো ভিন্ন। শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন এবং খাতভিত্তিক সমঝোতার মাধ্যমে কর্মীদের বেতন নির্ধারণ করা হয়। ফলে সরকারি নির্ধারিত হার না থাকলেও অধিকাংশ শ্রমিক তুলনামূলক উচ্চ মজুরি পান। এই মডেলকে অনেকে “নর্ডিক মডেল” হিসেবে উল্লেখ করেন, যা শ্রমিক ও নিয়োগকর্তার পারস্পরিক আস্থার উপর দাঁড়িয়ে আছে।
সার্বিকভাবে ২০২৬ সালের ইউরোপে ন্যূনতম বেতনের চিত্র একদিকে অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রতিফলন, অন্যদিকে সামাজিক সুরক্ষা নীতির অগ্রগতির ইঙ্গিত। লুক্সেমবার্গে যেখানে ন্যূনতম বেতন দুই হাজার সাতশ ইউরোর বেশি, সেখানে বুলগেরিয়ায় তা ছয়শ ইউরোর কিছু বেশি, এই পার্থক্য ইউরোপের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। তবে ক্রয়ক্ষমতা, জীবনযাত্রার ব্যয়, কর কাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা বিবেচনায় নিলে বাস্তব ব্যবধান কিছুটা ভিন্ন আকার ধারণ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী বছরগুলোতে ইউরোপীয় ইউনিয়নজুড়ে পর্যাপ্ত ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করার বিষয়ে আরও সমন্বিত নীতি দেখা যেতে পারে। শ্রমবাজারে দক্ষতার চাহিদা বৃদ্ধি, অভিবাসন, স্বয়ংক্রিয়তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার, সব মিলিয়ে ইউরোপের মজুরি কাঠামো নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ন্যূনতম বেতনের এই চিত্র শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং এটি ইউরোপের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, সামাজিক ন্যায়বিচার ও কর্মসংস্থানের গতিপথ বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।


